প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে লেবাননে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের দ্রুত দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে বৈরুতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। একই সঙ্গে যারা আপাতত দেশ ছাড়তে পারছেন না, তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। লেবাননে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরাইলের ধারাবাহিক বিমান হামলা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দূতাবাস।
মঙ্গলবার সকালে প্রকাশিত এক নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় দূতাবাস জানায়, পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের যত দ্রুত সম্ভব লেবানন ত্যাগ করা উচিত। বিশেষ করে যদি পরিস্থিতি নিরাপদ বলে মনে হয়, তবে বৈরুত রফিক হারিরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া মিডল ইস্ট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ব্যবহার করে দেশ ছাড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দূতাবাসের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময় এসেছে যখন লেবাননের রাজধানী বৈরুত এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় টানা বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এই হামলায় বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ, ধ্বংস এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইসরাইলের দাবি, তারা মূলত ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর বিভিন্ন স্থাপনা ও ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালাচ্ছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলটিতে দীর্ঘদিন ধরেই হেজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি রয়েছে বলে ইসরাইলের অভিযোগ। সেই কারণেই ইসরাইলি বাহিনী সেখানে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। হামলার ফলে বহু মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদেরও জরুরি ভিত্তিতে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। বাহিনীর মুখপাত্র আভিচায় আদ্রেয়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, লিতানি নদীর দক্ষিণে হেজবুল্লাহর তৎপরতা বাড়ার কারণে ইসরাইল কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি স্থানীয় জনগণকে দ্রুত ঘরবাড়ি ছেড়ে লিতানি নদীর উত্তরে নিরাপদ এলাকায় চলে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ইসরাইলি বাহিনীর এই সতর্কবার্তার পর দক্ষিণ লেবাননের অনেক এলাকায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার রাতারাতি ঘরবাড়ি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অঞ্চলে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সবাই যে সহজে নিরাপদ স্থানে যেতে পারছেন, এমনও নয়। ফলে অনেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সোমবার ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তারা লেবাননের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম আল-কার্দ আল-হাসান অ্যাসোসিয়েশন। ইসরাইলের অভিযোগ, এই প্রতিষ্ঠানটি হেজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং সংগঠনটির আর্থিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হেজবুল্লাহ অর্থ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সেই কারণে এসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরু থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৮৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ, যাদের অনেকের অবস্থা গুরুতর।
অবিরাম বোমাবর্ষণ এবং সংঘর্ষের কারণে লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। হাসপাতালগুলোতে আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের লেবাননে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিচ্ছে এবং সেখানে অবস্থানরত নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সতর্কবার্তা এই উদ্বেগেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল ও হেজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে লেবানন ও ইসরাইল সীমান্তে সংঘাত তীব্র হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংঘাতের দ্রুত অবসান এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং উত্তেজনাপূর্ণ রয়ে গেছে।
লেবাননের সাধারণ মানুষ এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশটির জনগণ নতুন করে যুদ্ধের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিস্ফোরণের শব্দ, ধ্বংসস্তূপ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন চলছে।
এই বাস্তবতায় বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা সেই উদ্বেগকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে বলে সতর্ক করে দূতাবাস জানিয়েছে, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।