একজন নারী উদ্যোক্তার পেছনের গল্প কখনোই সহজ হয় না

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৯ বার

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

একটি অনলাইন দোকান, একটি হস্তশিল্পের স্টল, কিংবা একটি ছোট কারখানার মালিকানা—সাফল্যের এই দৃশ্যপটের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একান্ত সংগ্রামের গল্প। বিশেষ করে যদি সেই উদ্যোক্তা হন একজন নারী। চারপাশের সামাজিক বাধা, পারিবারিক অনিচ্ছা, আর পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ছায়া পেরিয়ে একজন নারী যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন তার পথচলাটা কেবল পুঁজি আর পরিকল্পনার বিষয় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে মনোবল, আত্মবিশ্বাস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক নিরব লড়াই।

বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তা হওয়ার পথ এখনও নানা প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ণ। অনেকে ভাবেন, নারী মানেই গৃহস্থালী কাজের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবেন। ব্যবসা? সেটি ‘পুরুষের জগৎ’। এই মানসিকতা ভেঙে বেরিয়ে আসাটাই হয়ে ওঠে প্রথম প্রতিবাদ, প্রথম পদক্ষেপ।

সানজিদা , সিলেটের এক কর্মী। বড় হয়েছেন ছোট্ট একটি ভাড়া বাড়িতে। বাবার অল্প আয়ে সংসার চলে না বলে, মাত্র ১৭ বছর বয়সেই সেলাই শিখে ঘরে বসে ব্লাউজ ও থ্রি-পিস বানাতে শুরু করেন। সামাজিক দৃষ্টি এড়িয়ে কাজ চালানোটা সহজ ছিল না। কেউ কেউ মুখে না বললেও তাকে ‘অসুস্থ প্রতিযোগী’ ভাবত, কেউ আবার বলত—“মেয়ে মানুষ, এত কিছু শিখে কী হবে?”

কিন্তু রোকসানা থামেননি। ধীরে ধীরে তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, আশেপাশের আরও ৫ জন নারীকে নিয়ে একটি ছোট কারখানা গড়ে তুলেছেন। এখন তিনি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সারা দেশেই পোশাক বিক্রি করেন, নানা মেলায় অংশ নেন এবং নিজের কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণও দেন। তবে এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দিনের পর দিন ঘুমহীন রাত, বিনা পুঁজিতে শুরু করা পথ, এবং পরিবার ও সমাজের অব্যাহত চাপ মোকাবিলার এক কঠিন অধ্যায়।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য শুধু ব্যবসায়িক বাধাই নয়, রয়েছে নিরাপত্তার সংকট, আইনি সহায়তার ঘাটতি, এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের দুর্বলতা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে এখনো অনেক নারীকে পুরুষ আত্মীয়ের গ্যারান্টির মুখোমুখি হতে হয়। অনলাইনে ব্যবসা করতে গেলে হেনস্তা ও প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনাও কম নয়।

তবুও এই সমাজে অনেক নারী নিজেদের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখছেন। তাঁরা শুধু নিজের জন্য নয়, বরং নিজেদের চারপাশের নারীদের জন্যও উদাহরণ হয়ে উঠছেন। তারা দেখিয়ে দিচ্ছেন—নারী মানেই ‘দয়া করে সুযোগ দেওয়া’ কেউ নন, বরং সামর্থ্যবান, সাহসী এবং সৃষ্টিশীল এক শক্তি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের জন্য দরকার টেকসই সহায়তা ব্যবস্থা—যার মধ্যে রয়েছে সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা। সেইসঙ্গে সবচেয়ে জরুরি—মানসিকভাবে এই সমাজকে প্রস্তুত করা, যেন একজন নারী ব্যবসা করলে সেটিকে ‘অসাধারণ’ বা ‘ব্যতিক্রম’ বলে নয়, বরং একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত পেশা হিসেবে দেখা হয়।

এই সংগ্রামগুলোর গল্প যত প্রকাশ পাবে, তত অন্য নারীরাও এগিয়ে আসার সাহস পাবেন। কারণ একজন নারী উদ্যোক্তার সাফল্যের পেছনে থাকে অসংখ্য না বলা কথা, উপেক্ষিত চেষ্টা, লুকানো অশ্রু, আর গভীর রাতের একাকী জেগে থাকা।

তবুও তারা এগিয়ে যান—নিজেকে, পরিবারকে এবং সমাজকে বদলে দেওয়ার আশায়। এবং এই পথচলায় তাঁদের গল্পই একদিন হয়ে উঠবে অন্য অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর। কারণ সত্যি বলতে, একজন নারী উদ্যোক্তার পেছনের গল্প কখনোই সহজ হয় না—তবে সেটিই হয় সবচেয়ে মূল্যবান।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত