গাইবান্ধায় ঝড়ে লণ্ডভণ্ড ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
গাইবান্ধায় আকস্মিক ঝড়ে ৫ শতাধিক ঘর লন্ডভন্ড

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হঠাৎ করে নেমে আসা এক প্রলয়ংকরী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে গাইবান্ধার জনপদ যেন এক রাতেই বদলে গেছে। উপজেলার পর উপজেলা জুড়ে ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়া গাছ, ছিন্নবিচ্ছিন্ন টিনের চালা আর বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে ডুবে থাকা গ্রামগুলো এখন এক গভীর দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা-র পশ্চিমাঞ্চলে এই দুর্যোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে।

সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে আকস্মিকভাবে বয়ে যাওয়া এই ঝড় ছিল ভয়াবহ। স্থানীয়রা বলছেন, হঠাৎ করেই দমকা হাওয়া শুরু হয়, এরপর তীব্র ঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টি। মুহূর্তের মধ্যেই অনেক কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে, টিনের চালা উড়ে যায়, গাছপালা ভেঙে ঘরের ওপর পড়ে। এই দুর্যোগে অন্তত ৫ শতাধিক বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কেউ কেউ রাতের অন্ধকারেই ঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। অনেক পরিবার তাদের সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের ঘরবাড়ি ছিল টিনশেড বা কাঁচা কাঠামোর।

ঝড়ের তীব্রতায় বিদ্যুতের ৯টি খুঁটি উপড়ে পড়েছে, যার ফলে উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের ৯টি ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্ধকারে ডুবে থাকা এই এলাকাগুলোতে রাত কাটাতে হয়েছে চরম দুর্ভোগের মধ্যে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে যোগাযোগ ও জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে পরিস্থিতি পরিদর্শনে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে দ্রুত সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঝড়ে শুধু ঘরবাড়িই নয়, কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৯৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে উঠতি ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষক তাদের পুরো মৌসুমের ফসল হারিয়ে হতাশায় ভুগছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সাপমারা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ, চকরহিমাপুর, খামারপাড়া, মাদারপুর এবং দরবস্ত ইউনিয়নের গোশাইপুর, রামনাথপুর, দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক ঘরের টিনের চালা কয়েকশ গজ দূরে গিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও গাছ ভেঙে ঘরের ওপর পড়ে পুরো বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।

দুর্যোগের ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে এর পুনরাবৃত্তি। এর আগের রাতেও একই উপজেলার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়, যা অনেক বাড়ি-ঘর দুর্বল করে দেয়। ফলে দ্বিতীয় দিনের ঝড়ে সেই ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এতে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি দ্বিগুণ হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে মানবিক সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট দেখা দিয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন।

স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো, এত বড় ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের আকস্মিক ঝড়ের প্রবণতা বাড়ছে, যা গ্রামীণ জনপদকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

এই দুর্যোগ শুধু একটি রাতের ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ইঙ্গিত দেয়। দুর্বল অবকাঠামো, দারিদ্র্য এবং প্রস্তুতির অভাব—সব মিলিয়ে গ্রামীণ মানুষ বারবার এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হচ্ছে।

গাইবান্ধার এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এবং শক্তিশালী অবকাঠামো কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসন এবং কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সহায়তা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

সব মিলিয়ে, এক রাতের ঝড় গাইবান্ধার বহু মানুষের জীবনযাত্রা ও স্বপ্নকে এলোমেলো করে দিয়েছে। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত সহায়তা এবং নতুন করে দাঁড়িয়ে ওঠার সুযোগ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত