প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল নামতেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে বেড়েছে যানবাহনের চাপ। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে যমুনা সেতু এলাকায়, যেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ডসংখ্যক যানবাহন পারাপার হয়েছে এবং টোল আদায়েও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সময়ে সেতু দিয়ে মোট ৪৬ হাজার ৯৪৩টি যানবাহন চলাচল করেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এই বিপুল যান চলাচলের ফলে টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৩৯ লাখ ৪ হাজার ৬৫০ টাকা, যা ঈদযাত্রার ব্যস্ততার একটি শক্তিশালী সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিদিন যেখানে গড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার যানবাহন পারাপার হয়, সেখানে ঈদের সময় এই সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ কিংবা কখনো তিনগুণ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে সেতুটির ওপর চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ, যা সামগ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে।
যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত ১২টা থেকে মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘণ্টার হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকামুখী যানবাহনের সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৪৪৫টি। এসব যানবাহন থেকে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৪ হাজার ৮০০ টাকা। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গমুখী যানবাহনের সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৪৯৮টি, যেখান থেকে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫০ টাকা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গমুখী যানবাহনের সংখ্যা ঢাকামুখী যানবাহনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে ঈদকে সামনে রেখে রাজধানী ছাড়ার প্রবণতা। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ একসঙ্গে বাড়ির পথে রওনা হওয়ায় এই একমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
টাঙ্গাইল-যমুনা মহাসড়ক বরাবরের মতোই এই সময়ে দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়কে পরিণত হয়েছে। সড়কের বিভিন্ন অংশে ধীরগতির যানজট তৈরি হলেও এখনো বড় ধরনের স্থবিরতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানিয়েছেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেতুর দুই পাশে মোট ১৮টি টোল বুথ চালু রাখা হয়েছে, যাতে দ্রুত যানবাহন পারাপার নিশ্চিত করা যায়। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা বুথ রাখা হয়েছে, যাতে ছোট যানবাহনের চাপ আলাদাভাবে সামাল দেওয়া যায় এবং মূল লেনে ভিড় কমে।
তিনি আরও জানান, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে সংশ্লিষ্ট টিমগুলো। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদযাত্রার সময় যানজটের অন্যতম কারণ হলো চালকদের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি এবং সড়কে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ। অনেক ক্ষেত্রে ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা কিংবা ট্রাফিক নিয়ম না মানার কারণে যানজট আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটলে তা দীর্ঘ সময়ের জন্য সড়ক অচল করে দিতে পারে।
মানবিক দিক থেকেও এই যাত্রা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন পর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য মানুষ এই কষ্টকর যাত্রাও সানন্দে মেনে নিচ্ছেন। তবে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৯৮ সালে চালু হওয়ার পর থেকে যমুনা সেতু দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পণ্য পরিবহন এবং যাত্রী চলাচলের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বিশেষ করে ঈদের সময় এই সেতুর ওপর নির্ভরশীলতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ঈদযাত্রার চাপ সামাল দিতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। টোল বুথের সংখ্যা বাড়ানো, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং চালকদের সচেতন করা গেলে এই চাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, যমুনা সেতুতে গত ২৪ ঘণ্টার টোল আদায়ের পরিসংখ্যান শুধু একটি অর্থনৈতিক তথ্য নয়, বরং দেশের মানুষের ঈদযাত্রার এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরছে। সামনে ঈদের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ আরও বাড়তে পারে, তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।