প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদুল ফিতরকে ঘিরে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে দেশের সড়কপথে, আর সেই চাপের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার পদ্মা সেতু এলাকা। তবে অন্যান্য বছরের মতো দীর্ঘ যানজটের চিত্র এবার দেখা যায়নি। যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও দ্রুত টোল আদায় এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রীরা নির্বিঘ্নেই সেতু পার হতে পারছেন, যা এবারের ঈদযাত্রায় একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে উঠে এসেছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) সকাল থেকেই পদ্মা সেতু সংলগ্ন এলাকায় যানবাহনের চাপ চোখে পড়ার মতো বেড়ে যায়। ভোর থেকেই বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং মোটরসাইকেলের সারি দেখা গেলেও কোথাও দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থবিরতা তৈরি হয়নি। টোল প্লাজায় স্বল্প সময়ের জন্য কিছু জটলা তৈরি হলেও তা দ্রুতই কেটে গেছে। ফলে অপেক্ষার দীর্ঘ ভোগান্তি ছাড়াই যাত্রীরা সহজে সেতু পার হয়ে গন্তব্যের পথে এগিয়ে যেতে পেরেছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও টোল ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং দ্রুত সেবা দেওয়ার কারণে যানজট তৈরি হয়নি। পদ্মা সেতুর সহকারী প্রকৌশলী (টোল) মো. নাবিল হোসেন জানান, আগের দিনের মতোই আজও চাপ রয়েছে, তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সেতু দিয়ে ৩৮ হাজার ৫৫৭টি যানবাহন পারাপার হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এই সময়ে টোল আদায় হয়েছে ৪ কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ টাকা, যা সেতুর আর্থিক কার্যক্রমে ঈদযাত্রার প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
তবে সড়কপথের এই স্বস্তির চিত্রের পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতাও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মা সেতু এলাকায় যানবাহনের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অনেক যাত্রী বিকল্প উপায়ে যাত্রা করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে বাসের সংকটের কারণে অনেকেই খোলা ট্রাকে করে গন্তব্যের দিকে রওনা হচ্ছেন। পদ্মা সেতু উত্তর থানার সামনে থেকে বরিশালগামী যাত্রীদের ২০০ টাকা ভাড়ায় ট্রাকে যাত্রা করতে দেখা গেছে, যা নিরাপত্তার দিক থেকে উদ্বেগজনক।
এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ঈদের আনন্দযাত্রাকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, খোলা ট্রাকে যাত্রা করা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবুও সময়মতো বাড়ি পৌঁছানোর তাগিদে অনেকেই এই ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যেখানে আগে ফেরি পারাপারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেখানে কয়েক মিনিটেই সেতু পার হওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে ঈদের মতো ব্যস্ত সময়ে এই সেতুর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এবারের ঈদযাত্রায় যানজট না থাকার বিষয়টি সেতুর কার্যকারিতা এবং ব্যবস্থাপনার দক্ষতার একটি বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনায় আরও উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে। বিশেষ করে সেতুর আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত গণপরিবহন নিশ্চিত করা গেলে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যাত্রা শুধুমাত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বিষয় নয়। এটি পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা এবং উৎসবের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই এই যাত্রাকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে, পদ্মা সেতু এলাকায় যানবাহনের চাপ থাকলেও যানজট না থাকা এবারের ঈদযাত্রায় স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। তবে পরিবহন সংকট এবং ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান না করা গেলে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে সকল যাত্রী নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।