রেলক্রসিংয়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল চালু করবে সরকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২২ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার মর্মান্তিক বাস-ট্রেন সংঘর্ষ যেন আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল দেশের মহাসড়কজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোর ভয়াবহ বাস্তবতা। এক মুহূর্তের অসতর্কতা, আর তাতেই ঝরে গেল একাধিক প্রাণ। এমন প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন সরকারের কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও খাদ্যমন্ত্রী আমিনুর রশীদ

রোববার সকাল গড়িয়ে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকায় দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান মন্ত্রী। চারপাশে তখনো শোকের ভারী আবহ, বিধ্বস্ত বাসের ধ্বংসাবশেষ যেন নীরবে জানাচ্ছিল ভয়ংকর সেই রাতের গল্প। ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, দেশের মহাসড়কের ওপর থাকা রেলক্রসিংগুলোতে ধাপে ধাপে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প নেই। অনেক ক্রসিংয়ে এখনো ম্যানুয়াল গেট বা পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেই। ফলে চালকদের ভুল কিংবা অসতর্কতা বড় দুর্ঘটনার রূপ নেয়। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল চালু হলে ট্রেন আসার আগেই যানবাহন থামানোর কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই ঘোষণা শুধু একটি প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলিত এক সমস্যার প্রতি নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে এমন অসংখ্য রেলক্রসিং রয়েছে, যেখানে নেই গেটম্যান, নেই কার্যকর সংকেত ব্যবস্থা। ফলে স্থানীয়দের কাছে এগুলো প্রায় “মৃত্যুফাঁদ” হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

দুর্ঘটনার বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, শুধু দায় নির্ধারণই নয়, ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটে, সেই দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এদিকে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতেও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে রাজধানী ঢাকা কিংবা বিদেশেও পাঠানোর কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা হিসেবে ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

ঘटनাস্থল পরিদর্শনের পর তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেন। সেখানে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হন। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তখন স্বজন হারানোর কান্না আর আহতদের যন্ত্রণায় ভারী হয়ে ছিল পরিবেশ।

এর আগে শনিবার গভীর রাতে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড রেলক্রসিংয়ে ঘটে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা। একটি যাত্রীবাহী বাস, যা উত্তরাঞ্চল থেকে নোয়াখালীর দিকে যাচ্ছিল, সেই সময় রেলক্রসিং অতিক্রম করার চেষ্টা করে। ঠিক তখনই ঢাকামুখী একটি দ্রুতগতির মেইল ট্রেন বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, সংঘর্ষের পর ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায়। মুহূর্তেই বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়, আর ভেতরে থাকা যাত্রীরা হয়ে পড়েন অসহায়। এই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই বহু মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।

উদ্ধারকাজে অংশ নেয় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক জনি বড়ুয়া জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মো. ইদ্রিস প্রাথমিকভাবে ধারণা দিয়েছেন, অসতর্কতার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে। তবে চূড়ান্ত কারণ জানতে তদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশে রেলক্রসিং দুর্ঘটনা নতুন নয়। প্রায়ই এমন খবর শোনা যায়, যেখানে অরক্ষিত বা অর্ধ-নিয়ন্ত্রিত ক্রসিংয়ে প্রাণহানি ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ন এবং যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়নি।

এই বাস্তবতায় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল চালুর ঘোষণা অনেকের কাছে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ দেশের সব ক্রসিংয়ে আধুনিক প্রযুক্তি বসাতে প্রয়োজন বিপুল অর্থ, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় চালকের অসতর্কতা বা নিয়ম না মানার প্রবণতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

কুমিল্লার এই দুর্ঘটনা আবারও একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—আর কত প্রাণ গেলে নিরাপদ হবে রেলক্রসিং? সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ যদি দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবে হয়তো ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা কিছুটা হলেও কমে আসবে।

এখন সবার চোখ সেই প্রতিশ্রুতির দিকে, যা বাস্তবায়িত হলে দেশের সড়ক ও রেলপথের সংযোগস্থলগুলো আর মৃত্যুফাঁদ নয়, বরং নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তায় পরিণত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত