প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করেছে ইরান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ড খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফাকারি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে নয়, বরং কার্যত নিজেদের সঙ্গেই আলোচনা করছে।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সামরিক নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কটাক্ষ করে এই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ইব্রাহিম জুলফাকারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এতটাই গভীর যে তারা এখন নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করছে বলে মনে হচ্ছে। তার এই মন্তব্যে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয় যে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না এবং বিষয়টিকে তারা অভ্যন্তরীণ বিভ্রান্তি হিসেবে দেখছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ধরনের মতৈক্য বা সমঝোতা হওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত এবং সেখানে কোনো ধরনের মধ্যপথ নেই। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা আরও কঠোর ও জটিল বলে তুলে ধরেন।
এই বক্তব্যের এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত শেষ করতে ইরান সমঝোতায় আসতে আগ্রহী হতে পারে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
ট্রাম্প আরও বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং মার্কিন স্বার্থ ও বিনিয়োগ সুরক্ষিত না হলে যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরবে না। তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে।
এদিকে ইরানের পক্ষ থেকে আসা পাল্টা মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক সামরিক অভিযান, বিমান হামলা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক ভাষ্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর। উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে এবং সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে বক্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করছে। এতে করে বাস্তব কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
ইরানের সামরিক মুখপাত্রের বক্তব্যে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, দেশটি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অবস্থান নিয়ে কোনো ধরনের আপস করতে প্রস্তুত নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে তারা বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাত কেবল সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনাকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এক পক্ষ যখন আলোচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্য পক্ষ সেটিকে প্রত্যাখ্যান করছে, ফলে কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর ওপরও এই উত্তেজনার প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক দেশই পরিস্থিতি শান্ত করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
ইব্রাহিম জুলফাকারির মন্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইরান এখন তাদের অবস্থান থেকে সরে আসতে অনিচ্ছুক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতিকে তারা গ্রহণযোগ্য মনে করছে না। একই সঙ্গে তারা নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কথার লড়াই এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার ইঙ্গিত দিলেও, অন্যদিকে ইরান সেই আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এতে করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে এই বাকযুদ্ধ ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্ব ব্যবস্থার ওপর।