প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কয়ার আজ পরিণত হয়েছে এক বর্ণিল আয়োজনের কেন্দ্রে। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন উদ্দীপনায় শুরু হয়েছে কুচকাওয়াজ, যেখানে রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা এবং জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য প্রদর্শন দেখা যাচ্ছে। সকাল থেকেই দেশপ্রেমের আবেগে ভরপুর এই আয়োজন ঘিরে জমেছে হাজারো মানুষের ভিড়, যারা নিজেদের উপস্থিতির মাধ্যমে স্বাধীনতার এই মাহেন্দ্রক্ষণকে আরও অর্থবহ করে তুলেছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো প্যারেড স্কয়ারে তৈরি হয় আনুষ্ঠানিকতা ও শৃঙ্খলার এক বিশেষ পরিবেশ। সামরিক বাহিনীর চৌকস পদচারণা, সুসংগঠিত মার্চপাস্ট এবং বিভিন্ন কুচকাওয়াজ দলের সমন্বিত পরিবেশনা মুহূর্তেই দর্শকদের মনোযোগ কেড়ে নেয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করেন। এ ছাড়া তিন বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি কূটনীতিকরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তাদের উপস্থিতি শুধু আনুষ্ঠানিক গুরুত্বই বাড়ায়নি, বরং এই আয়োজনের আন্তর্জাতিক তাৎপর্যও তুলে ধরেছে।
এই কুচকাওয়াজ আয়োজনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়-এর নির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ-এর তত্ত্বাবধানে নবম পদাতিক ডিভিশনের ব্যবস্থাপনায় এই আয়োজন বাস্তবায়িত হয়েছে। রমজানের শুরু থেকেই প্যারেড স্কয়ারে প্রস্তুতি শুরু হয়, যা চূড়ান্ত রিহার্সেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয় কয়েকদিন আগে। এই দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল আজকের সুশৃঙ্খল ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কুচকাওয়াজে অংশ নেয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, যারা নিজেদের প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং সক্ষমতার নিখুঁত প্রদর্শন করে। তাদের পাশাপাশি অংশ নেয় বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যরা। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সমন্বিত গতিবিধি যেন দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ দিক ছিল সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন এই আয়োজনে। কারও মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা, কেউবা হাতে ছোট পতাকা উড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। তাদের চোখেমুখে ছিল গর্ব, আনন্দ এবং স্বাধীনতার প্রতি গভীর ভালোবাসা। প্যারেড স্কয়ারে দর্শকদের বসার জন্য প্লাস্টিকের চেয়ার রাখা হলেও অনেকেই দাঁড়িয়ে থেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন, যা তাদের আগ্রহ ও আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ।
এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাধীনতা দিবসে কুচকাওয়াজ বন্ধ ছিল। যদিও বিজয় দিবসে সীমিত পরিসরে এই আয়োজন চালু ছিল, তবে স্বাধীনতা দিবসে এমন জমকালো আয়োজন দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হলো। ফলে এবারের কুচকাওয়াজ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগে এই আয়োজনকে নতুন মাত্রা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্বকে আরও বেশি করে তুলে ধরতে এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে এই ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, এই আয়োজন দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। একইসঙ্গে চিকিৎসা সহায়তা এবং জরুরি সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়, যা একটি বৃহৎ আয়োজনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
সব মিলিয়ে, জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিত এই কুচকাওয়াজ ছিল একটি আবেগঘন, বর্ণিল এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ আয়োজন, যা দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতির সালাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজন কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শনী নয়, বরং এটি ছিল একটি জাতির ঐক্য, গর্ব এবং অগ্রযাত্রার প্রতীক। স্বাধীনতার ৫৫তম বছরে এসে এই আয়োজন দেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে দেশপ্রেমের সঞ্চার করেছে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করেছে।