খুলনার মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তল অযত্নে, সংরক্ষণ শূন্য উদ্যোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬
  • ১৩ বার
খুলনায় অযত্নে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খুলনা শহরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলা ও অযত্নের শিকার। একাত্তরের গণহত্যা এবং বর্বরতার নীরব সাক্ষী হিসেবে পরিচিত গল্লামারী স্মৃতি সৌধ ও চুকনগর বধ্যভূমি যদিও আংশিকভাবে সংরক্ষিত, বাস্তবে এসব স্থানের অবস্থা হতাশাজনক। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক এবং সচেতন নাগরিকরা উদ্বিগ্ন, কারণ ইতিহাস সংরক্ষণে এখনো পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

গল্লামারী এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনার অন্যতম গণহত্যাস্থল হিসেবে পরিচিত। সেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অসংখ্য বুদ্ধিজীবী, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিল। তবে বর্তমানে সেখানে দেখা যায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আবর্জনার স্তূপ এবং মাঝে মাঝে মাদকসেবীদের আনাগোনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার অভাবে এই ঐতিহাসিক স্থান তার মর্যাদা হারাচ্ছে। গল্লামারীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা হতাশ।

চুকনগর গণহত্যা দেশের ইতিহাসের এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত। ২০ মে ১৯৭১ সালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেন, এই হত্যাযজ্ঞ ভারতগামী শরণার্থীদের ওপর পরিকল্পিত ছিল এবং এমনকি ভদ্রা নদীর পানি পর্যন্ত রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। চুকনগরে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভও দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে ও অপ্রতিষ্ঠিত অবস্থায় রয়েছে। স্বাধীনতার পর এসব স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও তা মূলত দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।

একাত্তর স্মৃতি পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম জানান, নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হলে এসব স্থানকে সংরক্ষণ ও পরিচর্যার আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, বারবার সরকারি আশ্বাস পাওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। খুলনার রনাঙ্গনের যোদ্ধা এবিএম নুরুল আলমও উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা শহরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেই।

গল্লামারী ও চুকনগরের জন্য সীমানা প্রাচীর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র ও লাইব্রেরিসহ পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়িত হয়নি। খুলনা মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মনিরুজ্জামান মনি এসব পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক আ ম স জামসেদ খোন্দকার জানান, নতুন পরিকল্পনার আওতায় খুলনার মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো উন্নয়ন ও সংরক্ষণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “খুলনার মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে তাদের বিভিন্ন দাবির কথা জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ জরুরি। প্রস্তাবনাগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রতই নতুন পরিকল্পনায় এসব স্থানের উন্নয়ন করা হবে।”

শুধু গল্লামারী বা চুকনগর নয়, শিরোমণি যুদ্ধক্ষেত্র, নিউজপ্রিন্ট মিলের ভেতরে শহীদদের কবর, ভুতের বাড়ি এলাকার প্রথম রাজাকার ক্যাম্প, নয়াবাটির মুন্সিবাড়ী এবং রূপসায় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীর মহিবুল্লাহর সমাধিসহ অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন আজও অরক্ষিত। এসব স্থান কেবল স্থাপনা নয়, বরং জাতির বীরত্বগাঁথার জীবন্ত দলিল।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ করা মানে শুধু অতীত স্মরণ নয়, নতুন প্রজন্মকে জাতির ইতিহাস, বীরত্ব এবং ত্যাগের গল্প জানানো। যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ছাড়া ইতিহাস বিকৃত বা বিস্মৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইতিহাসবিদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং সচেতন নাগরিকরা একমত যে, সরকারের সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোগ এবং সম্প্রদায়ের সচেতনতা মিলিত হলে খুলনার মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধগুলো ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

খুলনার এসব স্মৃতিসৌধ ও বধ্যভূমি কেবল গণহত্যার সাক্ষী নয়, বরং স্বাধীনতার চেতনাকে জীবন্ত রাখার প্রতীক। তাই ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া এখনই অত্যন্ত জরুরি, যাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিত হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস পৌঁছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত