প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রায় চার সপ্তাহ ধরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। এই সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্বের তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি, এটি বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সার সরবরাহের প্রধান পথও। প্রণালিটি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে ব্যাপক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
উপসাগরের এই জলপথে ইরানের হুমকি ও সীমিত সামরিক আক্রমণের কারণে সমস্ত যানবাহন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ট্যাংকারগুলো নিরাপদভাবে চলাচল করতে না পারায় তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থিরতা শুধু অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করছে না, বরং বিভিন্ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং খাদ্য সরবরাহেও সমস্যার সৃষ্টি করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি মোকাবিলায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছেন। একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা মোতায়েন এবং সম্ভাব্য মার্কিন নৌবাহিনী প্রহরার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছেন, যাতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। তবে ইরানের কৌশল এখনো যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং অপ্রচলিত সামরিক কৌশল। ইরানের সস্তা ড্রোন এবং সমুদ্র মাইন ব্যবহারের সক্ষমতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলি এই জলপথে ট্যাংকার রক্ষা বা সামরিকভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা জানান, তারা প্রণালির নিরাপদ যাতায়াতের জন্য নির্দিষ্ট ট্যাংকার থেকে অর্থ আদায় করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবেন। এর মাধ্যমে প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণে রেখে ইরান কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করছে। ২৩ মার্চ, লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অন্তত দুটি জাহাজ প্রণালিটি পার হওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করেছে। এটি ইরানের জন্য একটি নতুন রেভিনিউ উৎস হিসেবে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শুধু তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নয়, এটি ইরানের কূটনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। তেলের বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলিকে কৌশলগতভাবে চাপ দিতে সক্ষম হচ্ছে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক নানা পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
তবে মার্কিন প্রশাসন আশ্বস্ত করছে যে, তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ইরানের কৌশলগত অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত জলপথে নিয়ন্ত্রণ এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য চাপের কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বোঝা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালি শুধু ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্র নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করছে। ইরানের কৌশলগত দৃষ্টিকোণ এবং জলপথের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।