ময়মনসিংহের ত্রিশালে আলামিন হত্যা মামলায় পাঁচজনের যাবজ্জীবন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
ত্রিশালে আলামিন হত্যা, পাঁচজনের যাবজ্জীবন

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মোক্ষপুর এলাকায় জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সংঘটিত আলোচিত আলামিন হত্যা মামলায় পাঁচজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে এই রায় ঘোষণা করেন বিশেষ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফারহানা ফেরদৌস। একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালতের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মোক্ষপুরের সেনের চকপাড়া গ্রামের মৃত শুক্কুর আলীর ছেলে আব্দুর রশিদ ও জসিম উদ্দিন, জসিম উদ্দিনের স্ত্রী হুরেনা খাতুন, তাদের ছেলে রিয়াদ এবং আব্দুর রশিদের মেয়ে জোনাকি আক্তার। আদালত তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

মামলার নথি ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার সূত্রপাত ছিল জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুল ইসলামের সঙ্গে একই গ্রামের জসিম উদ্দিন ও তার পরিবারের মধ্যে জমি নিয়ে মতবিরোধ চলছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিরোধ চরম আকার ধারণ করে এবং তা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়।

২০২৩ সালের ১৯ জুন দুপুরে সংঘটিত সেই মর্মান্তিক ঘটনার দিনটি এখনো স্থানীয় মানুষের মনে আতঙ্কের স্মৃতি হয়ে আছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন জসিম উদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশীয় অস্ত্র—দা ও বল্লমসহ—নিয়ে হাফিজুল ইসলামের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। ঘটনার সময় হাফিজুল ইসলাম ও তার ভাইয়েরা বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না, ফলে বাড়িতে থাকা নারী সদস্যদের ওপরই হামলার মূল আঘাত পড়ে।

প্রবাসী কামরুজ্জামানের স্ত্রী নূরজাহানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এই অবস্থায় নূরজাহানের ছেলে আলামিন মাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পরদিন নিহতের চাচা হাফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে ত্রিশাল থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে।

মামলার বিচারিক কার্যক্রমে ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ, যুক্তি-তর্ক এবং দীর্ঘ শুনানির পর আদালত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেন। বিচারক তার রায়ে উল্লেখ করেন, এই হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত এবং নির্মম, যা সমাজে ভয়াবহ বার্তা দেয়। তাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আকরাম হোসেন রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ভুক্তভোগী পরিবার কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম জানিয়েছেন, তারা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

এই ঘটনার মানবিক দিকটি বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। একটি সাধারণ পারিবারিক বিরোধ কীভাবে একটি তরুণ প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, তা এই মামলায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আলামিনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্য একটি শোকাবহ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় বাসিন্দারা এখনো সেই দিনের কথা স্মরণ করে শঙ্কিত হয়ে ওঠেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জমিসংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের বিরোধ যথাসময়ে সুষ্ঠুভাবে সমাধান না হলে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। ফলে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ জরুরি।

এই রায় সেই দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একটি বার্তা দেয় যে সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে কোনো বিরোধের সমাধান সম্ভব নয় এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

সব মিলিয়ে, ত্রিশালের এই হত্যাকাণ্ড এবং তার বিচার প্রক্রিয়া সমাজে ন্যায়বিচারের গুরুত্বকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত