একাত্তর নিয়ে বিএনপিকে প্রশ্ন শফিকুরের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬৬ বার
একাত্তর নিয়ে বিএনপিকে প্রশ্ন শফিকুরের

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও এর উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়, নতুন ভাষ্য তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে তা আবারও সামনে চলে আসে। এবার সেই বিতর্কে নতুন করে আগুন জ্বালালেন শফিকুর রহমান। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন—যে রাজনৈতিক দল ১৯৭১ সালে অস্তিত্বই লাভ করেনি, তারা কীভাবে ‘একাত্তরের মালিকানা’ দাবি করে?

রোববার অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায়, যেখানে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা উপস্থিত ছিলেন, সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এই প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে দেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের ব্যবহার, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে তার সমালোচনা।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যে একাত্তর, নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে নিজেদের অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে। তার ভাষায়, “সবকিছু যেন তাদের—অন্য কারো কোনো ভূমিকা নেই।” এই অবস্থানকে তিনি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ইতিহাসের এই একচেটিয়া ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, ১৯৭১ সালে বিএনপির অস্তিত্ব ছিল না, ফলে মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব একটি দল হিসেবে বিএনপি নিতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক সময় বিএনপি তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান-এর ভূমিকার কথা তুলে ধরে। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তার ভূমিকা অবশ্যই সম্মানের দাবিদার। তবে একজন ব্যক্তির অবদান দিয়ে পুরো যুদ্ধের কৃতিত্ব একটি রাজনৈতিক দলের ওপর আরোপ করা সঠিক নয়।

তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিকতা। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ, যেখানে অসংখ্য মানুষ বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। সেই যুদ্ধের কৃতিত্ব এক ব্যক্তি বা একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হলে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান আড়ালে পড়ে যায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সব কৃতিত্ব দেওয়া হয়, তাহলে অন্যান্য যোদ্ধাদের অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়?

শফিকুর রহমানের বক্তব্যে শুধু বিএনপি নয়, ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর প্রতিও সমালোচনা উঠে আসে। তিনি বলেন, অতীতেও দেখা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের সুবিধামতো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছে। তার ভাষায়, এটি এক ধরনের “ইতিহাস কুক্ষিগত করার প্রবণতা”, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে এমন সময়ও এসেছে যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ছোট করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, এক সময় জিয়াউর রহমানকে নিয়েও বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছিল, যা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তার মতে, এই ধরনের রাজনীতি দেশের জন্য কল্যাণকর নয় এবং ভবিষ্যতে তা পরিহার করা প্রয়োজন।

এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। ফলে এই ইতিহাসকে কেন্দ্র করে যে কোনো বক্তব্যই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই এই ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে, যা কখনো কখনো বিভ্রান্তি তৈরি করে।

একজন বিশ্লেষক বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো দলের সম্পত্তি নয়, বরং পুরো জাতির অর্জন।” তার মতে, ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা না করে বরং ঐকমত্য তৈরি করা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ইতিহাস জানতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ শফিকুর রহমানের বক্তব্যকে যৌক্তিক মনে করছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে, যেখানে বিভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসছে।

একজন তরুণ শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা ইতিহাস জানতে চাই নিরপেক্ষভাবে। কে কোন দল থেকে কী বলছে, সেটা নয়—আমরা জানতে চাই আসল সত্যটা কী।” তার এই বক্তব্য বর্তমান প্রজন্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশার প্রতিফলন, যারা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিজেরা বিশ্লেষণ করতে অভ্যস্ত।

সব মিলিয়ে শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য আবারও প্রমাণ করে যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি জীবন্ত ও সংবেদনশীল বিষয়। এটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সময় আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কারণ, এই ধরনের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে না, বরং সমাজে বিভাজনও বাড়াতে পারে। তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা উচিত, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে এই বিতর্ক নতুন কিছু নয়, তবে এটি আবারও সামনে এসেছে নতুন ভাষ্যে। এই বিতর্কের মধ্যেই হয়তো একটি বড় প্রশ্ন লুকিয়ে আছে—বাংলাদেশ কি তার ইতিহাসকে একটি যৌথ ঐতিহ্য হিসেবে দেখতে পারবে, নাকি তা রাজনৈতিক বিভাজনের একটি হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত