প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত রাব্বী হত্যা মামলায় নতুন মোড় নিয়েছে আইনি প্রক্রিয়া। সেলিনা হায়াত আইভী-কে এ মামলায় নতুন করে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত। ফলে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর তালিকায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হলো, যা রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক আব্দুস সামাদ। তিনি জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার একটি হত্যা মামলায় আইভীকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর জন্য আবেদন করা হয়। আদালত গত ১২ এপ্রিল এ আবেদন গ্রহণ করে এবং তার প্রেক্ষিতে তাকে ওই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এই মামলাটি মূলত সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে ইন্টিরিয়র মিস্ত্রি সেলিম মণ্ডলের মৃত্যু ঘটে। একই ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে রাব্বী হত্যা মামলাটিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়ে ওঠে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্দোলনের সময়কার সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাগুলো একাধিক মামলার জন্ম দেয়, যার মধ্যে কয়েকটি মামলায় আইভীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আদালতের আদেশে শুধু শ্যোন অ্যারেস্ট মঞ্জুরই নয়, একই সঙ্গে তার জামিন আবেদনও নামঞ্জুর করা হয়েছে। এতে করে তার মুক্তির সম্ভাবনা আপাতত আরও দূরে সরে গেল। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
তবে আইভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন। তার দাবি, এ মামলায় আইভীকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং মূল এজাহারে তার নাম উল্লেখ ছিল না। তিনি বলেন, আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। অন্যথায় এটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মামলার তদন্তের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, বর্তমানে সেলিনা হায়াত আইভী মোট ১২টি মামলায় গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে হত্যা, সহিংসতা ও অন্যান্য ফৌজদারি অভিযোগ, যা ধাপে ধাপে তদন্তাধীন রয়েছে।
আইভীর গ্রেপ্তারের পেছনের প্রেক্ষাপটও বেশ নাটকীয়। গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার চুনকা কুটির থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একই বছরের নভেম্বরে হাইকোর্ট পাঁচটি মামলায় তাকে জামিন প্রদান করলেও পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত আপিল বিভাগে চ্যালেঞ্জ করা হয়।
এরপর আরও কয়েকটি মামলায় তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যার ফলে তার মুক্তি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধিরগঞ্জের সেলিম মণ্ডল ও রাব্বী হত্যা মামলাসহ মোট ১২টি মামলায় তিনি বর্তমানে অভিযুক্ত হিসেবে কারাগারে রয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একটি আইনি বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গভীরভাবে জড়িত। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র হিসেবে আইভীর একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে, যা এই মামলাগুলোর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে স্থানীয় জনগণের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন, আবার কেউ বলছেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হতে পারে। তবে আদালতের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে, রাব্বী হত্যা মামলায় সেলিনা হায়াত আইভীর শ্যোন অ্যারেস্ট মঞ্জুর হওয়া দেশের আইন ও রাজনীতির অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।