বৈশাখী উৎসবে রঙিন চট্টগ্রাম নগরী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪৭ বার
বৈশাখী উৎসবে রঙিন চট্টগ্রাম নগরী

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম: বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে বরণ করে নিতে বর্ণিল সাজে সেজেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নতুন বছরের প্রথম দিনেই নগরজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ অংশ নিয়েছে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন, মেলা, শোভাযাত্রা ও লোকজ উৎসবে। সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রূপ নেয় মিলনমেলায়, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে উদযাপিত হচ্ছে বাঙালির চিরায়ত এই উৎসব।

নগরীর প্রাণকেন্দ্র সিআরবি শিরীষতলা, ডিসি হিল, জিমনেসিয়াম মাঠ, পলোগ্রাউন্ড মাঠ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, মহসীন কলেজ, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, জামালখান এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উৎসবের প্রধান আয়োজনগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব স্থানে সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে। রঙ-বেরঙের পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, শাড়ি ও চুড়িতে সজ্জিত মানুষজন বৈশাখী গান, নাচ ও আবৃত্তির মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।

সিআরবি শিরীষতলায় সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন পরিষদের উদ্যোগে ভোর থেকেই শুরু হয় বর্ষবরণের মূল আয়োজন। সূর্যোদয়ের পরপরই বাঁশির সুর ও দলীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। এরপর একে একে মঞ্চে ওঠেন স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের গান, পাশাপাশি লোকজ সংগীতের মূর্ছনায় পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। দর্শনার্থীরা প্রাণভরে উপভোগ করেন এই সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

ডিসি হিল প্রাঙ্গণেও ছিল বৈশাখী উৎসবের আলাদা আকর্ষণ। ‘বোধন আবৃত্তি পরিষদ’, ‘প্রমিথিউস’সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীত পরিবেশিত হয়। নারী, পুরুষ ও শিশুদের অংশগ্রহণে এলাকা পরিণত হয় এক উৎসবমুখর মিলনমেলায়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সার্কিট হাউস থেকে ডিসি হিল পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আঁকা রঙিন আল্পনা নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও এবার নববর্ষ উদযাপন হয়েছে বিশেষ আঙ্গিকে। চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাসে আয়োজন করেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। বিশাল লোকজ মোটিফ, মুখোশ ও প্রতীকী শিল্পকর্মে সাজানো হয় পুরো ক্যাম্পাস। পাশাপাশি বৈশাখী মেলা, লোকজ খাবার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি করে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক উন্মুক্ত শিল্পমঞ্চে।

চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবেও দিনব্যাপী আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশ, মুড়ি-মুড়কি ও নানা দেশীয় খাবারের স্টল বসানো হয়। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় চলে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংবাদিক, তাদের পরিবার এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের অংশগ্রহণে প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণও রূপ নেয় বৈশাখী মিলনমেলায়।

উৎসবকে ঘিরে নগরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। সিআরবি, ডিসি হিল, জামালখান, চকবাজার, জিমনেসিয়াম মাঠ ও পতেঙ্গা সৈকতসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি টহল জোরদার করা হয়েছে যাতে উৎসব নির্বিঘ্ন ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন হয়।

নগরীর আন্দরকিল্লা, খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকার ব্যবসায়ীরাও নববর্ষকে ঘিরে পালন করেছেন পুরোনো ঐতিহ্য হালখাতা। দোকান সাজিয়ে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানোর মাধ্যমে শুরু হয়েছে নতুন বছরের ব্যবসায়িক কার্যক্রম। এতে নতুন ও পুরোনো সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

দিনভর তীব্র রোদ উপেক্ষা করেও নগরবাসীর আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ ভিড় করেছেন বিভিন্ন উৎসবস্থলে। শিশুদের হাসি, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং লোকজ আবহে ভরে ওঠে পুরো শহর। অনেকেই মনে করছেন, এই উৎসব শুধু বিনোদন নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

নতুন বছরের শুরুতে চট্টগ্রামজুড়ে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা নগরবাসীর মনে এনে দিয়েছে নতুন আশাবাদ। সবার প্রত্যাশা, নতুন বছর বয়ে আনবে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্প্রীতির আরও দৃঢ় বন্ধন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত