লালমনিরহাটের সদর হাসপাতাল নামেই ২৫০ শয্যা, সেবায় চরম সংকট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫৬ বার
লালমনিরহাট হাসপাতাল জনবল সংকট

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের লাখো মানুষের একমাত্র ভরসার জায়গা সদর হাসপাতাল। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে শত শত রোগী ছুটে আসেন এখানে, সুস্থতার আশায়। কিন্তু বাস্তবতা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। নামমাত্র ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও, সেবার মান ও সুযোগ-সুবিধা এখনও সেই পুরোনো সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আটকে আছে। অবকাঠামো আছে, কিন্তু নেই পর্যাপ্ত জনবল; আছে আধুনিক ভবন, কিন্তু নেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম। ফলে রোগীদের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছেই।

হাসপাতালের প্রবেশমুখে ঢুকলেই চোখে পড়ে দীর্ঘ লাইন। কেউ দাঁড়িয়ে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কেউ বসে আছেন মেঝেতে, আবার কেউ অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে বারান্দায় অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকের জন্য। রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে সামাল দেওয়া যেন কঠিন হয়ে উঠেছে। অথচ চিকিৎসকের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। যেখানে ১০৪ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১১ জন। এই বিশাল ঘাটতির কারণে চিকিৎসা সেবা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম।

জনবল সংকট শুধু চিকিৎসকেই সীমাবদ্ধ নয়, একই অবস্থা নার্স ও টেকনিশিয়ানদের ক্ষেত্রেও। ফলে যারা কর্মরত আছেন, তাদের ওপর কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেও তারা রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দিতে পারছেন না। এতে করে একদিকে যেমন রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসাকর্মীরাও মানসিক ও শারীরিক চাপের মুখে পড়ছেন।

এই হাসপাতালকে আধুনিক ও উন্নত সেবার আওতায় আনতে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ শয্যার একটি নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সেই সময় আশা করা হয়েছিল, নতুন এই ভবন চালু হলে জেলার স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আসবে। কিন্তু নানা জটিলতা ও প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে এত বছর পরও পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি এই ভবনটি। ফলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখনো অধরাই থেকে গেছে।

বর্তমানে হাসপাতালটি কার্যত ১০০ শয্যারও কম সক্ষমতা নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ রোগীর চাপ তার কয়েকগুণ বেশি। শয্যা সংকটের কারণে একই বেডে দুই থেকে তিনজন রোগীকে থাকতে দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের বারান্দা কিংবা মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় চিকিৎসা সেবার মান যে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই, তা সহজেই অনুমেয়।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও অনেকেই চিকিৎসকের দেখা পান না। আবার কখনো চিকিৎসাকর্মীদের সঙ্গে রোগী বা স্বজনদের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক সময় কর্মরতদের আচরণেও অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবু আল হাজ্জাজ নিজেও এই সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, লালমনিরহাটের মতো একটি জেলায় একটি মাত্র সদর হাসপাতালই মূল ভরসা। তাই এই হাসপাতালের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষদের জন্য এই হাসপাতালই শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু সেখানে যদি সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া যায়, তাহলে তাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই হবে না, এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও প্রয়োজন। একটি হাসপাতালের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার সেবার মানের ওপর, যা নিশ্চিত করতে হলে দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবল অপরিহার্য।

সব সংকট কাটিয়ে এই হাসপাতাল একদিন জেলার মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সেবার কেন্দ্র হয়ে উঠবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এখনই প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং নতুন ভবনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর ব্যবস্থা করা।

এখন প্রশ্ন একটাই—নামেই কি ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকবে, নাকি বাস্তবেও সেটি পূর্ণাঙ্গ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে লালমনিরহাটের লাখো মানুষ, যারা প্রতিদিন এই হাসপাতালের দিকে তাকিয়ে থাকেন একটি সুস্থ জীবনের আশায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত