প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন হত্যা মামলায় নতুন করে মোড় নিয়েছে তদন্ত প্রক্রিয়া। মামলার অন্যতম আলোচিত আসামি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পরিচালক ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মো. আফজাল নাছের ভূঁইয়াকে পঞ্চম দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর আদালতের এই আদেশকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহুল আলোচিত এ মামলা।
আদালত সূত্র জানিয়েছে, মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পুনরায় রিমান্ড আবেদন করে। তদন্তের স্বার্থে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তারা পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলেও আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর মধ্য দিয়ে মামলাটির তদন্তে নতুন মাত্রা যুক্ত হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে। বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন নিহত হন। ঘটনাটি তখনই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মামলা দায়ের হয় এবং দীর্ঘদিন পর নতুন করে তদন্তে গতি আসে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মামলার এজাহার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আফজাল নাছের ভূঁইয়ার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ওই সময় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থেকে বিরোধী পক্ষ দমনে নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা তার আবেদনে উল্লেখ করেন, এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, জড়িত অন্যান্য আসামিদের শনাক্তকরণ, ঘটনার সময় প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ এবং ব্যবহৃত অস্ত্র ও অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া মামলার নেপথ্যে কারা নির্দেশনা দিয়েছে এবং কীভাবে পুরো ঘটনাটি সংগঠিত হয়েছে তা বের করতে রিমান্ড অপরিহার্য বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আফজাল নাছের ভূঁইয়াকে গত ২৯ মার্চ রাতে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকেই একাধিক দফায় তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে ৩০ মার্চ একটি পৃথক মামলায় তার ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। এরপর একই হত্যা মামলায় ৮ এপ্রিল চার দিনের এবং ১২ এপ্রিল দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত। সর্বশেষ এই তিন দিনের রিমান্ডসহ মোট পাঁচ দফায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হলো।
মামলাটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ২০২২ সালের ওই ঘটনার সময় কয়েকশ নেতাকর্মী আহত হন, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৫৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। সেই তালিকায় আফজাল নাছের ভূঁইয়া ১৪৭ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
এদিকে মামলার বাদী পক্ষ এবং নিহত মকবুল হোসেনের পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার প্রত্যাশা করছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ায় তারা আশাবাদী যে প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
আইনজীবীদের একাংশ মনে করছেন, একাধিক দফায় রিমান্ড মঞ্জুরের মাধ্যমে তদন্তকারী সংস্থাকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তারা মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। তাদের মতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে তদন্ত যেমন গভীর হতে হবে, তেমনি আইনের শাসনও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মামলাটি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের একটি সংবেদনশীল প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। তদন্তের প্রতিটি ধাপ এখন জনমনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করছে। রিমান্ড শেষে তদন্তে কী নতুন তথ্য উঠে আসে এবং আদালতে কীভাবে তা উপস্থাপন করা হয়, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
এই মামলার অগ্রগতি আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই সবাই এখন অপেক্ষা করছেন—এই দীর্ঘ তদন্তের শেষ পর্যন্ত সত্য উদঘাটিত হবে কি না এবং ন্যায়বিচার কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।