দেশে বাড়ছে হাম: ঝুঁকিতে অপুষ্ট শিশুরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৮ বার
হাম: ঝুঁকিতে অপুষ্ট শিশুরা

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ আবারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য শিশু, আর একই সঙ্গে বাড়ছে জটিলতা ও মৃত্যুর সংখ্যাও। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি এখন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে, বিশেষ করে যেসব শিশু আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে তাদের জন্য এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে হামজনিত উপসর্গ ও জটিলতায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো লক্ষণ না থাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের সংক্রমণ সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে ওঠে পুষ্টিহীন শিশুদের ক্ষেত্রে। যেসব শিশু আগে থেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল, ডায়রিয়া বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভুগছে, তাদের ক্ষেত্রে হাম দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে। অনেক সময় নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট, চোখের সংক্রমণ এবং স্নায়বিক জটিলতা দেখা দেয়, যা শিশুকে আইসিইউ পর্যন্ত নিয়ে যেতে বাধ্য করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের প্রকোপ বাড়ার অন্যতম বড় কারণ হলো পুষ্টির ঘাটতি এবং প্রতিরোধক্ষমতার অভাব। দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পায় না। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীর তা মোকাবিলা করতে পারে না।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণের ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এর উপসর্গ প্রকাশ পায়। শুরুতে উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে দুর্বলতা দেখা দেয়। পরে ধীরে ধীরে সারা শরীরে লালচে র‌্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মুখের ভেতরে বিশেষ ধরনের সাদা দাগও দেখা যায়, যা রোগ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়, ফলে আক্রান্ত শিশু সহজেই অন্য সংক্রমণের শিকার হয়। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং কান বা চোখের সংক্রমণ এই রোগের সাধারণ জটিলতা হিসেবে দেখা যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনেক হাসপাতালে শয্যা সংকট তৈরি হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে আইসিইউ সুবিধা সীমিত থাকায় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের প্রকোপ কমাতে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট নিয়মিতভাবে প্রদান করা গেলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

তারা আরও বলছেন, সামাজিক সচেতনতা এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক পরিবার এখনো হামকে সাধারণ জ্বর বা ত্বকের রোগ হিসেবে ভুলভাবে দেখে, ফলে সময়মতো চিকিৎসা নেয় না। এতে রোগ আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে।

চিকিৎসা নির্দেশনায় বলা হচ্ছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার এবং সহজপাচ্য পুষ্টিকর খাদ্য অত্যন্ত জরুরি। তবে প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, ঝাল বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো শরীরের জটিলতা বাড়াতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমানভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

সার্বিকভাবে, হামের এই পুনরুত্থান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ, টিকাদান জোরদার এবং পুষ্টি নিশ্চিত না করা গেলে শিশু মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত