প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশুদের ওপর। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে এবং এর জটিল উপসর্গে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নতুন এই মৃত্যুর ঘটনায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে নিয়মিত বুলেটিনে এই তথ্য জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, মৃত আট শিশুর মধ্যে দুইজন সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, আর বাকি ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে হামের তীব্র জটিল উপসর্গের কারণে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে দেশে হামের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটেছে। এই সময়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭২ জনে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক মাসে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৫ জনে। একই সময়ে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২০ হাজার ৩৫২ জনে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সংক্রমণ কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শিশু হাসপাতাল এবং সংক্রামক রোগ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর ভিড় তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসায় জটিলতা বাড়ছে।
এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১৩ হাজার ১২৯ জন রোগী। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১০ হাজার ৪৯৬ জন। তবে এখনও বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের এই প্রাদুর্ভাব মূলত টিকাদানের ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তারা মনে করছেন, জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সহজেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই সময়মতো টিকা প্রদান এবং প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি, হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ব্যবস্থা জোরদার এবং টিকাদান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং এটি একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে না পারার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে স্কুল বন্ধ রাখা বা সাময়িকভাবে শিশুদের জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, জ্বর, র্যাশ, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। একই সঙ্গে টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ প্রতিরোধই এই রোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সব মিলিয়ে, হামের এই নতুন পরিস্থিতি দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ বাড়ছে। এখন জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।