প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদে দাঁড়িয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে, যেখানে মৌখিক প্রশ্নোত্তরের পরিবর্তে প্রশ্নগুলো কেবল টেবিলে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার অভিযোগ, এতে সংসদ সদস্যরা কার্যত তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং মন্ত্রীদের জবাবদিহিতা কমে যাচ্ছে।
রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এই বিষয়টি উত্থাপন করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে, সংসদের কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতার মূল ভিত্তিই হলো সরাসরি প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে আলোচনা।
তিনি বলেন, একটি কার্যকর সংসদের জন্য মন্ত্রীদের সরাসরি প্রশ্ন করা এবং তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে তারকা চিহ্নিত প্রশ্নগুলো মৌখিকভাবে না নিয়ে কেবল লিখিতভাবে টেবিলে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে সংসদ সদস্যদের সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ থাকছে না। তার ভাষায়, এতে সংসদ একটি ‘স্ক্রিপ্টেড মনোলগ সেশনে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও বলেন, সংসদ সদস্যদের কথা বলার সময় খুবই সীমিত। সেই অল্প সময়েই তারা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশ্নোত্তর পর্ব কার্যকর না থাকলে সেই সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। এতে সংসদীয় চর্চা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি সাম্প্রতিক একটি গ্রেপ্তার ইস্যুও তুলে ধরেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্টুন শেয়ার করার অভিযোগে হাসান ইনাম নামের এক ব্যক্তির গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি স্যাটায়ার বা মিম শেয়ার করার মধ্যে কীভাবে অপরাধের উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, অতীতেও এমন ঘটনার নজির থাকলেও বর্তমান সময়েও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উদ্বেগজনক। তার মতে, সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা মূলত অন্য ধরনের অপরাধের জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু সেটি ব্যবহার করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে।
এই বক্তব্যের জবাবে স্পিকার কার্যপ্রণালি বিধির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের অধিকারের প্রশ্ন উত্থাপনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, যেখানে আগাম নোটিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তা পর্যালোচনা করার আশ্বাস দেন তিনি।
অন্যদিকে চিফ হুইপ সংসদে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব সব সংসদ সদস্যের অধিকার, তবে বর্তমান সময়সূচির কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর দীর্ঘ আলোচনার কারণে সময় সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদীয় কার্যক্রম শেষ করতে হলে কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্ন টেবিলে উপস্থাপন করতে হচ্ছে। তবে সংসদের সময়সীমা বাড়ানো হলে আবারও পূর্ণাঙ্গ প্রশ্নোত্তর পর্ব চালু করা সম্ভব বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
কার্টুন শেয়ার করার অভিযোগে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, যদি শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র বা সমালোচনার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তাহলে তাকে মুক্তি দেওয়া উচিত। তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে তিনি এ ধরনের ঘটনায় সমর্থন করেন না এবং বিষয়টি ইতোমধ্যে নজরে এনেছেন।
তবে তিনি এটাও বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি শুধুমাত্র মতপ্রকাশের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু অন্য কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।
এই পুরো আলোচনার মধ্য দিয়ে সংসদের কার্যপ্রণালি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সংসদীয় প্রশ্নোত্তর পর্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
সব মিলিয়ে, সংসদে এই বিতর্ক নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নোত্তর পর্বের ভবিষ্যৎ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, তা আগামী দিনে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও গুরুত্ব পাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।