প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুদ্ধের প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে প্রযুক্তি। যেখানে একসময় কেবল মানব সৈন্যদের উপস্থিতিতেই যুদ্ধক্ষেত্র কল্পনা করা হতো, সেখানে এখন সেই বাস্তবতাই দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধে এবার সরাসরি দেখা গেল এক নতুন অধ্যায়—মানব সৈন্য ছাড়াই রোবট ও ড্রোনের মাধ্যমে শত্রু অবস্থান দখলের ঘটনা। বিষয়টি বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর একটি অভিযানে কোনো গুলি না ছুঁড়েই রুশ বাহিনীর একটি অবস্থান দখল করা হয়। এই অভিযান পরিচালিত হয় সম্পূর্ণভাবে স্থলভিত্তিক রোবট ও আকাশ ড্রোনের মাধ্যমে। এতে কোনো মানব সৈন্য সরাসরি অংশ নেয়নি, যা আধুনিক যুদ্ধ ইতিহাসে একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউক্রেনের থার্ড সেপারেট অ্যাসল্ট ব্রিগেডের এনসি১৩ ইউনিটের কমান্ডার মিকোলা “মাকার” জিনকেভিচ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “একটি গুলিও না ছুঁড়ে আমরা রুশ বাহিনীর অবস্থান দখল করেছি।” তার মতে, গত গ্রীষ্মে পরিচালিত এই অভিযানে রোবট ও ড্রোনের উপস্থিতিই শত্রুপক্ষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।
তিনি আরও দাবি করেন, এটি ইতিহাসে প্রথম ঘটনা যেখানে কোনো মানব সেনা ছাড়াই শত্রু অবস্থান দখল করা হয়েছে। যদিও এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এটিকে যুদ্ধ প্রযুক্তির একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
গত কয়েক বছর ধরে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ ড্রোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আকাশে ক্রমাগত নজরদারি এবং হামলার কারণে পদাতিক বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে ইউক্রেন স্থলভিত্তিক রোবট বা রিমোট-নিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ব্যবহার শুরু করে, যা ধীরে ধীরে যুদ্ধের কৌশলগত রূপ পরিবর্তন করছে।
প্রথমদিকে এসব রোবট ব্যবহার করা হতো আহত সৈন্য সরিয়ে নেওয়া, গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া এবং মাইন অপসারণের মতো সহায়ক কাজে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো সরাসরি আক্রমণ ও প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এখন এগুলোকে অনেকেই “ফ্রন্টলাইন সৈন্য” হিসেবে বিবেচনা করছেন।
জিনকেভিচ বলেন, “আমরা কখনোই সংখ্যায় রাশিয়ার সমান হতে পারব না। তাই প্রযুক্তির মাধ্যমেই আমাদের এগিয়ে থাকতে হবে।” তার মতে, স্থল ড্রোনগুলো গোপনে চলাচল করতে পারে এবং শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম, যা প্রচলিত সেনাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।
এই রোবটগুলো শুধু গোপনীয়তাই নয়, বহনক্ষমতা ও স্থায়িত্বের দিক থেকেও সুবিধাজনক। এগুলো বিভিন্ন আবহাওয়ায় কাজ করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে সক্রিয় থাকতে সক্ষম। আকাশ ড্রোনের তুলনায় স্থল রোবট ভারী সরঞ্জাম বহন ও স্থিতিশীল অপারেশন চালাতে বেশি কার্যকর বলে দাবি করা হচ্ছে।
গত বছরের শেষ দিকে ইউক্রেনের থার্ড আর্মি কর্পস জানিয়েছিল, একটি মেশিনগান-সজ্জিত স্থল রোবট টানা ৪৫ দিন রুশ বাহিনীর অগ্রগতি প্রতিরোধ করেছিল। সামান্য রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত চার্জের মাধ্যমে এটি দীর্ঘ সময় যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় ছিল, যা যুদ্ধ কৌশলে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
ইউক্রেনের লক্ষ্য হচ্ছে চলতি বছরের মধ্যে তাদের এক-তৃতীয়াংশ পদাতিক বাহিনীকে রোবট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা। দেশটির প্রেসিডেন্ট Volodymyr Zelenskyy জানিয়েছেন, গত তিন মাসে ২২ হাজারের বেশি মিশনে ড্রোন ও রোবট ব্যবহার করা হয়েছে। তার মতে, “সবচেয়ে বিপজ্জনক মিশনে একজন সৈন্যের পরিবর্তে রোবট পাঠিয়ে আমরা হাজারো জীবন রক্ষা করেছি।”
ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ রবার্ট টোলাস্ট মনে করেন, এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করবে। তার মতে, রোবট দিয়ে এলাকা দখল করা সহজ হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তবে সরবরাহ, উদ্ধার অভিযান এবং মাইন অপসারণে এসব প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই যুদ্ধে ইউক্রেন এখন ড্রোন ও রোবোটিক প্রযুক্তিতে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছেছে। জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মিখাইলো ফেদোরভ দায়িত্ব নেওয়ার পর এই খাতে আরও গতি আসে। তিনি প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ কৌশল চালু করেন, যেখানে শত শত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ড্রোন উন্নয়নে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে ধীর করে দিয়েছে এবং পাল্টা আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের যুদ্ধনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
তবে ইউক্রেন এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জিনকেভিচ বলেন, “চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় মানুষের হাতে থাকা উচিত। আমরা অস্ত্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে ছেড়ে দিতে পারি না।” তার মতে, রোবট মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মানব নিয়ন্ত্রণেই থাকা উচিত।
সব মিলিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার শুধু একটি সামরিক উদ্ভাবন নয়, বরং ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরণ কেমন হতে পারে তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। মানব সৈন্যের পরিবর্তে যন্ত্রনির্ভর যুদ্ধ ব্যবস্থা হয়তো ধীরে ধীরে বাস্তবতা হয়ে উঠছে—যা বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা ও নৈতিকতার নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।