প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বন্দুক সহিংসতার এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক অধ্যায় রচিত হয়েছে। Shreveport শহরে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে মাত্র ৩ থেকে ১১ বছর বয়সী আটটি শিশু। নিহতদের মধ্যে সাতজনই হামলাকারীর নিজের সন্তান—যা এই ঘটনাকে আরও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় সম্প্রদায় থেকে শুরু করে গোটা দেশকে। ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং মানবিকতার চরম বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ৩১ বছর বয়সী Shamar Elkins নামের এক ব্যক্তি এই নৃশংস হামলা চালান। তিনি তার সাত সন্তান এবং আরও এক শিশুকে গুলি করে হত্যা করেন। একই ঘটনায় তার স্ত্রীসহ দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী গুরুতর আহত হন এবং বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন। হামলার সময়কাল, পদ্ধতি এবং লক্ষ্যবস্তু—সবকিছু মিলিয়ে এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতার একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সময় রবিবার ভোর প্রায় ৫টার দিকে এই বিভীষিকাময় ঘটনার সূচনা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে নিজের স্ত্রীকে গুলি করে গুরুতর আহত করেন এলকিন্স। এরপর তিনি পাশের একটি বাড়িতে গিয়ে একে একে শিশুদের ওপর গুলি চালান। পরিস্থিতি এতটাই দ্রুত ও ভয়াবহভাবে অবনতি ঘটে যে আশপাশের মানুষজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে যায়।
ঘটনাস্থল থেকে বেঁচে যাওয়া একজন প্রত্যক্ষদর্শী দৌড়ে পাশের বাড়িতে গিয়ে জরুরি নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তিনটি আলাদা বাড়ি থেকে শিশুদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়, যা পুরো এলাকাকে শোকে স্তব্ধ করে দেয়। পুলিশ কর্মকর্তা Chris Bordelon জানান, ওয়েস্ট ৭৯ স্ট্রিট এবং হ্যারিসন স্ট্রিট এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
এই ঘটনায় নিহত শিশুদের পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়েছে। তারা হলো জায়লা এলকিন্স (৩), শায়লা এলকিন্স (৫), কায়লা পিউ (৬), লায়লা পিউ (৭), মার্কাইডন পিউ (১০), সারিয়াহ স্নো (১১), খেদারিয়ান স্নো (৬) এবং ব্রেলন স্নো (৫)। এদের মধ্যে সাতজন একই পরিবারের ভাই-বোন এবং একজন তাদের কাজিন। এত অল্প বয়সী শিশুদের এমন নির্মম মৃত্যু স্থানীয়দের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে।
ঘটনার সময় আরও একটি শিশু ছাদ থেকে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও তাকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। এই শিশুটি এখন এই ভয়াবহ ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের একজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হামলার পরপরই অভিযুক্ত একটি ছিনতাই করা গাড়িতে করে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশের ধাওয়া শুরু হলে এক পর্যায়ে বন্দুকযুদ্ধে সে নিহত হয়। এতে তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বন্ধ হয়ে গেলেও, পুলিশ বলছে তারা ঘটনাটির পেছনের কারণ খুঁজে বের করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
শহরের মেয়র Tom Arceneaux এক সংবাদ সম্মেলনে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “এটি আমাদের শহরের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনা। আমরা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সম্প্রদায়কে হারিয়েছি।” তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ঘটনাটি কতটা গভীরভাবে সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
শ্রেভপোর্ট পুলিশ প্রধান Wayne Smith বলেন, “এই ঘটনা কল্পনারও বাইরে। আমরা আমাদের পুরো সম্প্রদায়ের জন্য শোকাহত। কেন এবং কীভাবে এমন একটি ঘটনা ঘটল, তা খুঁজে বের করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” তিনি জানান, Louisiana State Police-এর সহযোগিতায় তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। Gun Violence Archive-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে Joliet-এ আটজন নিহত হওয়ার ঘটনার পর এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনা। পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিয়ত বন্দুক সহিংসতা বাড়ছে এবং এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিরীহ মানুষ, বিশেষ করে শিশু।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানসিক সংকটের প্রতিফলন। পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সহজে অস্ত্রের প্রাপ্যতা—সবকিছু মিলিয়েই এমন বিপর্যয় ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শ্রেভপোর্টের এই ঘটনার পর স্থানীয় মানুষজন শোক ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই ঘটনাস্থলের আশপাশে জড়ো হয়ে নিহতদের স্মরণে ফুল ও মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন। ছোট ছোট কফিনে শায়িত শিশুদের কথা ভাবতেই চোখে জল চলে আসছে সবার। এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য এক গভীর ক্ষত।
সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে বন্দুক সহিংসতা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু হারানো প্রাণগুলো আর ফিরে আসবে না। এই ট্র্যাজেডি যেন ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকে—এমনটাই আশা করছে বিশ্ববাসী।