প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের করনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সাবেক কর্মকর্তারা। তাদের মতে, করহার বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রচলিত কৌশল দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত এক সেমিনারে এসব মতামত উঠে আসে। লেকশোর হোটেলে আয়োজিত এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমান। সেখানে দেশের কর কাঠামো, রাজস্ব আদায় কৌশল এবং ব্যবসা পরিবেশ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, করদাতারাই মূলত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকৃত গ্রাহক। তারাই অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করা হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। বক্তাদের মতে, বিশেষজ্ঞ বা আমলাদের প্রস্তাবিত কঠোর করনীতি বাস্তবায়ন করলে বিনিয়োগ পরিবেশ নষ্ট হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয়ও কমে যেতে পারে।
সেমিনারে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, নীতিনির্ধারণ এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। অনেক সময় কেন্দ্রীয়ভাবে তৈরি করা কর আইন ব্যবসায়িক বাস্তবতায় প্রয়োগযোগ্য হয় না। তিনি বলেন, করনীতি প্রণয়নের আগে ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্থায়ী পরামর্শক কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যা নীতিগত সিদ্ধান্তকে আরও বাস্তবসম্মত করতে সহায়তা করবে।
তিনি আরও বলেন, কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো আগেভাগে আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া উচিত, যাতে ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে প্রস্তুত থাকতে পারেন। তার মতে, বাজেট প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ব্যাপক পর্যালোচনা না হলে পরবর্তীতে পরিবর্তনের সুযোগ খুব সীমিত থাকে।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, উচ্চ করহার সবসময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক উন্নয়নশীল দেশে করহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও করজাল বিস্তৃত হওয়ায় রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে কার্যকর করহার তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি সত্যিকারের টেকসই রাজস্ব কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, তবে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। পাশাপাশি ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন চালু করার ওপর তিনি জোর দেন, যাতে হয়রানি কমে এবং স্বচ্ছতা বাড়ে।
ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরাও সেমিনারে করনীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। নেসলে বাংলাদেশ-এর লিগ্যাল ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্স পরিচালক দেবব্রত চৌধুরী বলেন, কর বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর ধারণা বাস্তবে সঠিক নয়। তার মতে, কর বাড়ালে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, ফলে ভোগ কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, করদাতাদের প্রকৃত সমস্যা ও বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে নীতি তৈরি করলে ব্যবসার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা বিনিয়োগ হ্রাসের কারণ হতে পারে। তার মতে, করদাতাদের প্রতি আস্থাশীল এবং সহায়ক মনোভাব ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হবে না।
এমসিসিআইর ট্যাক্স ও ট্যারিফ কমিটির চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ বলেন, বাজেট প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে বিপুল সংখ্যক টিআইএনধারী থাকলেও কর রিটার্ন জমার হার কম হওয়ায় নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, বাজেট প্রণয়নের আগে ব্যাপক আলোচনা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়। তিনি এনবিআরের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলির কারণে নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা আরও বলেন, সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের ওপর উচ্চ কর আরোপ করা হচ্ছে, যা নীতিগত বৈপরীত্য তৈরি করছে।
একইভাবে পানির মতো অপরিহার্য পণ্যের ওপর কর আরোপ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। বক্তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভোক্তা পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করে এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে, তখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে একটি স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামো অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।
এমসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে সেমিনারে কিছু প্রস্তাবও উপস্থাপন করা হয়। সেখানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২০ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। রপ্তানি ও সরবরাহ খাতে উৎসে কর কমানোরও সুপারিশ করা হয়, যাতে ব্যবসা খরচ কমে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ে।
সব মিলিয়ে সেমিনারের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—বাংলাদেশের করনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। করহার বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রচলিত ধারণার পরিবর্তে করজাল সম্প্রসারণ, নীতির স্বচ্ছতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় অর্থনীতির গতিশীলতা ও বিনিয়োগ প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।