জাপানে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামির শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
জাপানে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামির শঙ্কা

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ Japan আবারও কেঁপে উঠল শক্তিশালী এক কম্পনে। সোমবার উত্তর-পূর্ব উপকূলে আঘাত হানা ৭.৫ মাত্রার এই ভূমিকম্প দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিকভাবে বড় ধরনের প্রাণহানির খবর না এলেও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সুনামির আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় জরুরি সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। সম্ভাব্য ৩ মিটার পর্যন্ত সুনামি ঢেউ আঘাত হানতে পারে বলে জানানো হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

Japan Meteorological Agency জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে, এবং এর গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার। কম গভীরতার কারণে ভূমিকম্পটি তীব্রভাবে অনুভূত হয় এবং এর প্রভাব বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে Iwate Prefecture, Aomori Prefecture এবং Hokkaido অঞ্চলে বড় ধরনের ঢেউ আঘাত হানার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভূমিকম্পের পরপরই উপকূলীয় এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয় এবং বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। টেলিভিশন সম্প্রচারমাধ্যম NHK-এর সরাসরি সম্প্রচারে দেখা গেছে, হোক্কাইডোর হাচিনোহে বন্দরে নোঙর করা জাহাজগুলো দ্রুত সাগরে সরে যাচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য সুনামি ঢেউয়ের ধাক্কা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। পর্দাজুড়ে ভেসে ওঠা ‘সুনামি! সরে যান!’ সতর্কবার্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ঘটনার পরপরই দেশটির প্রধানমন্ত্রী Sanae Takaichi জরুরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে একটি টাস্ক ফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, “এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপত্তা। সবাইকে শান্ত থেকে নির্দেশনা মেনে চলতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দ্রুত সরে যেতে হবে।” তার এই আহ্বান সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

ভূমিকম্পের প্রভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও বিঘ্ন ঘটে। Kyodo News জানায়, জাপানের মূল দ্বীপ হনশুর উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত আওমোরিতে বুলেট ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে করে যাত্রীদের মধ্যে ভোগান্তি সৃষ্টি হলেও নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

জাপানের নিজস্ব ভূকম্পন তীব্রতা স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ‘উচ্চ ৫’, যা অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হয়। এই মাত্রার কম্পনে সাধারণত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, রিইনফোর্সমেন্টবিহীন কংক্রিটের দেয়াল ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে, যদিও জাপানের আধুনিক নির্মাণব্যবস্থা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অফ ফায়ার’-এর অংশ, যেখানে পৃথিবীর বেশিরভাগ ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে ৬ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ২০ শতাংশ ভূমিকম্প জাপানে সংঘটিত হয়। এমনকি দেশটিতে গড়ে প্রতি পাঁচ মিনিটে অন্তত একটি কম্পন অনুভূত হয়, যদিও সেগুলোর বেশিরভাগই ক্ষতিকর নয়।

বর্তমান ভূমিকম্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সম্ভাব্য প্রভাব পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর। যদিও হোক্কাইডো এবং তোহোকু অঞ্চলে বর্তমানে কোনো সক্রিয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু নেই, তবুও সেখানে বন্ধ থাকা কিছু কেন্দ্র রয়েছে। Tohoku Electric Power জানিয়েছে, তারা ওনাগাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর ভূমিকম্প ও সম্ভাব্য সুনামির প্রভাব পরীক্ষা করছে। একইভাবে Hokkaido Electric Power Company-ও তাদের স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানের উন্নত সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া নেওয়ার সক্ষমতা বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তি এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।

তবে মানবিক দিক থেকে এই ধরনের ঘটনা সবসময়ই গভীর প্রভাব ফেলে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষজন আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগে সময় পার করছেন। অনেকেই পূর্বের সুনামির ভয়াবহ স্মৃতি মনে করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও জাপানের দিকে নজর রাখছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সহমর্মিতা জানানো হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। যদিও এখনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবুও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সব মিলিয়ে, জাপানের এই ভূমিকম্প আবারও প্রমাণ করে যে প্রকৃতির শক্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে দ্রুত পদক্ষেপ, সচেতনতা এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব—এটাই এখন জাপানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত