প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে এই যুদ্ধে রাশিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে যে আলোচনা চলছিল, তা নিয়ে অবশেষে সরাসরি অবস্থান পরিষ্কার করল ইরান। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই যুদ্ধে রাশিয়ার কোনো গোয়েন্দা বা সামরিক সহায়তা ইরান পায়নি।
রাশিয়ার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ভেদোমোস্তি’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জালালি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সক্রিয় সহায়তার যে দাবি পশ্চিমা মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। তার মতে, পশ্চিমা বিশ্ব নিজেও জানে যে এই অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এ ধরনের দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আন্তর্জাতিক জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
জালালি আরও ব্যাখ্যা করেন, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে যেসব গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি রয়েছে, সেগুলো যুদ্ধের অনেক আগেই স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তিগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং এটি কৌশলগত সহযোগিতার অংশ। কিন্তু চলমান যুদ্ধের সঙ্গে এই সম্পর্ককে জড়িয়ে দেখা সঠিক নয়।”
যুদ্ধের প্রভাব যে দুই দেশের যৌথ প্রকল্পগুলোর ওপর পড়েছে, তা স্বীকার করেছেন ইরানি রাষ্ট্রদূত। বিশেষ করে রাশত-আস্তারা রেলপথ নির্মাণ এবং পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির বাস্তবায়ন কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে তিনি এটিও নিশ্চিত করেছেন যে এসব প্রকল্প বাতিল হয়নি, বরং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কাজ পুনরায় গতি পাবে। তার ভাষায়, “এগুলো আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ এবং আমরা এগুলো বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
এই সংঘাতের কূটনৈতিক দিক নিয়েও মন্তব্য করেন জালালি। তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে যা অর্জন করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে অর্জনের আশা করা অবাস্তব। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “যুদ্ধে যে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি, আলোচনার মাধ্যমেও তা অর্জন করা যাবে না।”
ইরানি রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শুরুতে এই দুই দেশ ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বলেছিল। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, তাদের লক্ষ্য ততই সীমিত হয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার মতো একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যা তার মতে, তারাও অর্জন করতে পারেনি।
জালালি বলেন, “তারা বলেছিল কয়েক দিনের মধ্যে পুরো ইরান দখল করে শাসনব্যবস্থা বদলে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তারা কী অর্জন করেছে? উত্তর হচ্ছে—কিছুই না।” তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ইরান এই সংঘাতকে নিজেদের প্রতিরোধ সক্ষমতার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, প্রথমে বড় ধরনের রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে এগোলেও পরে তারা ধীরে ধীরে কৌশল পরিবর্তন করে। কিন্তু সেই পরিবর্তনও কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারেনি। এমনকি ঘোষিত নৌ অবরোধও কার্যকর হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে বলেও জানান রাষ্ট্রদূত। তার ভাষায়, এই যুদ্ধ ইরানের সংকল্পকে দুর্বল করার পরিবর্তে আরও শক্তিশালী করেছে। “আমাদের জনগণ এবং নেতৃত্ব এখন আরও ঐক্যবদ্ধ। আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অটল,”—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বক্তব্য মূলত একটি কূটনৈতিক বার্তা, যা একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ‘প্রাক-বিদ্যমান সহযোগিতা’ হিসেবে তুলে ধরছে। এতে বোঝা যায়, ইরান একদিকে নিজেদের স্বাধীন সামরিক সক্ষমতা তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়েও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে এই সংঘাতের প্রভাবও কম নয়। বিশেষ করে জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট, সেটিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের এই অবস্থান স্পষ্ট করে যে তারা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী রাখতে চায়। রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা সরাসরি অস্বীকার করে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছে। তবে এই বক্তব্য কতটা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, তা সময়ই বলে দেবে।