ধূমপানমুক্ত প্রজন্ম গড়তে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক আইন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ বার
ধূমপানমুক্ত প্রজন্ম গড়তে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক আইন

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ধূমপানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে এবার নতুন এক যুগে প্রবেশ করল যুক্তরাজ্য। দেশটির সংসদের উভয় কক্ষ ‘টোব্যাকো অ্যান্ড ভেপস বিল’ পাস করার মাধ্যমে এমন একটি আইন প্রণয়নের পথে এগিয়েছে, যা কার্যকর হলে ১৭ বছর বা তার কম বয়সীদের জন্য সিগারেট কেনা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। শুধু একটি প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যতের পুরো সমাজকে ধূমপানের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এই পদক্ষেপকে “জাতির স্বাস্থ্যের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এই আইন বাস্তবায়িত হলে এমন একটি ধূমপানমুক্ত প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা আজীবন তামাকজাত পণ্যের আসক্তি এবং এর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে দূরে থাকতে পারবে। তিনি বলেন, এটি শুধু একটি স্বাস্থ্যনীতি নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমান উন্নয়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

প্রস্তাবিত আইনের মূল লক্ষ্য হলো ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারির পর জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের কখনোই সিগারেট কেনার সুযোগ না দেওয়া। অর্থাৎ যারা বর্তমানে ১৭ বছর বা তার কম বয়সী, তারা ভবিষ্যতেও আইনগতভাবে তামাকজাত পণ্য কিনতে পারবেন না। এই ধারা কার্যকর হলে প্রতি বছর নতুন প্রজন্ম ধূমপানমুক্ত থেকে যাবে, যা ধীরে ধীরে পুরো সমাজে ধূমপানের হার কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই আইন কার্যকর হওয়ার জন্য এখন প্রয়োজন রাজকীয় অনুমোদন। একবার এটি আইনে পরিণত হলে সরকার আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, শিশুদের খেলার মাঠ, স্কুলের আশপাশ এবং হাসপাতালের বাইরের মতো উন্মুক্ত স্থানেও ধূমপান নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। একইসঙ্গে ভেইপিং নিয়ন্ত্রণেও কঠোরতা আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। ভেইপের স্বাদ, প্যাকেজিং এবং বিপণন কৌশল সীমিত করার মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করার প্রবণতা কমিয়ে আনা হবে।

বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে ভেইপিং বা ই-সিগারেট ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। রঙিন প্যাকেট, আকর্ষণীয় স্বাদ এবং সহজলভ্যতার কারণে এটি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় ব্রিটিশ সরকার ইতোমধ্যেই ডিসপোজেবল ভেইপ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এখন নতুন এই বিলের মাধ্যমে ভেইপিং নিয়ন্ত্রণে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ‘অ্যাকশন অন স্মোকিং অ্যান্ড হেলথ’-এর পরিচালক হেজেল চিজম্যান বলেন, এই বিল জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ধূমপান এবং ভেইপিং—দুই ক্ষেত্রেই তরুণদের রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি, এবং এই আইন সেই লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে ধূমপানজনিত কারণে। এটি দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী। শুধু মৃত্যুই নয়, ধূমপান বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগেরও প্রধান কারণ, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএস-এর ওপর এর আর্থিক ও কাঠামোগত চাপ ব্যাপক। তাই এই আইনকে শুধু স্বাস্থ্য রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখলে, ব্রিটেন একেবারে নতুন কিছু করছে না, তবে তাদের উদ্যোগটি সবচেয়ে বিস্তৃত ও সুপরিকল্পিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ড প্রথম দেশ হিসেবে এমন একটি আইন প্রণয়ন করেছিল, যেখানে ২০০৮ সালের পর জন্মগ্রহণকারীদের কাছে সিগারেট বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ২০২৩ সালে সেই আইন বাতিল করা হয়। অপরদিকে, মালদ্বীপও ২০০৭ সালের পর জন্মগ্রহণকারীদের জন্য সিগারেট বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে, যা এই ধরনের উদ্যোগের বিস্তারকে নির্দেশ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আইন বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োগ নিশ্চিত করা। কাগজে-কলমে আইন প্রণয়ন সহজ হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন। বিশেষ করে অবৈধ বাজার, কালোবাজারি এবং সামাজিক অভ্যাস পরিবর্তন—এই বিষয়গুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ব্রিটিশ সরকার মনে করছে, কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

সমালোচনার দিকও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। আবার অনেকেই বলছেন, বয়সভিত্তিক স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে সমর্থকদের যুক্তি হলো, জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিযুক্ত এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

সব মিলিয়ে, ব্রিটেনের এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী তামাকবিরোধী আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অন্যান্য দেশও একই ধরনের উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত হতে পারে। ধূমপানমুক্ত একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার এই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত এটি স্পষ্ট যে, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ব্রিটেন একটি সাহসী এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত