বিদ্যুৎ সংকটে গার্মেন্টসের ভরসা এখন সোলার শক্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার
বিদ্যুৎ সংকটে গার্মেন্টসের ভরসা এখন সোলার শক্তি

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জ্বালানি সংকটে চাপে পড়া দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতকে স্থিতিশীল রাখতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় এবার প্রতিটি গার্মেন্টস কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা ও সার্ভিস ফি-তে ছাড়ের ঘোষণাও এসেছে, যাতে উদ্যোক্তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত হন।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে পড়েছে। প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কারখানাগুলোতে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালু রাখা হলেও পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ না থাকায় সেটিও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।

এই পরিস্থিতিতে বিজিএমইএ সদস্য কারখানাগুলোর জন্য সোলার প্যানেল স্থাপনকে বাধ্যতামূলক না হলেও শক্তভাবে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। সংগঠনটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং একটি বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই প্যাকেজের আওতায় উদ্যোক্তারা ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি যারা আগামী তিন মাসের মধ্যে সোলার প্যানেল স্থাপন করবেন, তাদের ক্ষেত্রে সার্ভিস ফি-এর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মওকুফ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

বিজিএমইএ পরিচালক মো. এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, শিল্পখাতে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় সোলার শক্তি এখন বাস্তবসম্মত বিকল্প। যদি প্রতিটি কারখানা তাদের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে, তাহলে মোট বিদ্যুৎ খরচের অন্তত ২০ শতাংশ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। এটি শুধু উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতেই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পখাতের খরচ কমাতেও সহায়ক হবে।

তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে এখন পরিবেশগত মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর। ফলে টেকসই ও সবুজ উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কেবল বিকল্প নয়, বরং রপ্তানি টিকিয়ে রাখার জন্য বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত হচ্ছে। এই কারণে সোলার প্যানেল স্থাপন এখন একটি কৌশলগত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

তবে গার্মেন্টস মালিকদের একটি অংশ বলছে, শুধুমাত্র উৎসাহমূলক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়। আমদানি নীতিতে জটিলতা, উচ্চ শুল্কহার এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে সোলার প্যানেল স্থাপন অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা মনে করছেন, সরকার যদি নির্দিষ্ট নীতিমালা বা বিশেষ এসআরও (Statutory Regulatory Order) জারি করে, তাহলে এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, এই উদ্যোগ সফল করতে হলে সরকারি নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য। বিশেষ করে সোলার প্যানেল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমানো না গেলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন না। তাই দ্রুত একটি সমন্বিত নীতি ঘোষণা করা প্রয়োজন।

অর্থনীতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বিজিএমইএর এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও টেকসই সমাধান হিসেবে দেখছেন। চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে শিল্পখাতে বিকল্প শক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সোলার শক্তি ব্যবহার শুধু উৎপাদন ব্যয় কমাবে না, বরং পরিবেশগত দিক থেকেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে অবস্থিত ৪ হাজারেরও বেশি কারখানা এবং ইপিজেড এলাকায় আরও প্রায় ৬০০ কারখানা মিলিয়ে এই খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় আসে। ফলে এই খাতে যেকোনো উৎপাদন ধস জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞরা একমত যে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তবে এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত নীতি সহায়তা, আর্থিক প্রণোদনা এবং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা।

সব মিলিয়ে, বিজিএমইএর সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ দেশের গার্মেন্টস শিল্পে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সরকার, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত