প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় তিন ফসলি কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কৃষিজমির টপসয়েল ধ্বংসের এমন ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের এ অভিযানকে অনেকেই কৃষিজমি রক্ষায় সময়োপযোগী ও কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সদরপুর উপজেলার ভাষানচর ইউনিয়নের আমিরাবাদ মৌজার সুশীল মণ্ডলের ডাঙ্গী এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া। অভিযানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে ট্রাকে করে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু ওই জমিই নয়, আশপাশের কৃষি পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি তারা মৃধা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কৃষিজমির টপসয়েল কেটে বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে প্রমাণ পাওয়ার পর বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়।
অভিযান চলাকালে স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষ প্রশাসনের উপস্থিতি পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র রাত-দিন কৃষিজমির মাটি কেটে নিচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ফলে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক তাদের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বলেও জানান।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া বলেন, কৃষিজমি কোনোভাবেই ধ্বংস করা যাবে না। এটি শুধু একটি জমি নয়, বরং আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। তিনি আরও বলেন, মাটিখেকো চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান নিয়মিতভাবে চলবে এবং কোনোভাবেই কৃষিজমির ক্ষতি মেনে নেওয়া হবে না।
তিনি স্থানীয় জনগণকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেখানে কৃষিজমি থেকে মাটি কাটা বা পরিবেশ ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ড দেখা যাবে, সেখানে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে হবে। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের অপরাধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে স্থানীয় পরিবেশবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এই স্তরেই জমির উর্বরতা নির্ভর করে। একবার এই মাটি কেটে নিলে জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনুর্বর হয়ে পড়ে, যা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। তারা মনে করেন, অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে আরও কঠোর নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছু অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কৃষিজমি থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইটভাটা ও বিভিন্ন নির্মাণ কাজে সরবরাহ করছে। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব খননকৃত জমিতে জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় কৃষিজমি রক্ষা করা জাতীয় দায়িত্ব। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জমির ওপর চাপ বাড়ছে, তাই বিদ্যমান আবাদযোগ্য জমি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় খাদ্য নিরাপত্তা ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সদরপুরের এই অভিযানকে স্থানীয় প্রশাসনের একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন অনেকে। তারা মনে করছেন, এমন উদ্যোগ নিয়মিতভাবে চললে কৃষিজমি রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
অভিযান শেষে প্রশাসন জানায়, কৃষিজমি রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে কেউ আর কৃষিজমি ধ্বংসের মতো অপরাধে জড়াতে না পারে।
সামগ্রিকভাবে সদরপুরের এই ঘটনা শুধু একটি আইন প্রয়োগের উদাহরণ নয়, বরং কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষার প্রতি প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় জনগণ আশা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের অভিযান নিয়মিত হলে তাদের কৃষিজমি ও জীবিকা নিরাপদ থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি টেকসই পরিবেশ পাবে।