প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মৃত্যু মানুষের জীবনের অবধারিত সত্য। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সুরা আলে ইমরান: ১৮৫)। এই চূড়ান্ত বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাতই চিরস্থায়ী। কিন্তু মৃত্যুর পর আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু রীতি ও আনুষ্ঠানিকতা—বিশেষ করে কুলখানি, তৃতীয় দিন বা চল্লিশার আয়োজন—নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন থেকে যায়।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম সমাজে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার মৃত্যুর তৃতীয় দিনে “কুলখানি” এবং চল্লিশতম দিনে “চল্লিশা” নামে বড় পরিসরে খাবারের আয়োজন করা হয়। আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজনদের পাশাপাশি সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও এসব অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। তবে ইসলাম এই ধরনের নির্দিষ্ট দিনভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতাকে কীভাবে দেখে, সেটিই মূল আলোচনার বিষয়।
ইসলাম মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, তার মাগফিরাত কামনা করা এবং জীবিতদের জন্য শিক্ষাগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ব্যতীত—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। অর্থাৎ মৃত্যুর পর মানুষের উপকারে আসে এমন আমল মূলত দোয়া, দান-সদকা এবং উপকারী কাজের সওয়াব।
ইসলামি শরিয়তে কোথাও নির্দিষ্ট করে বলা নেই যে মৃত্যুর তৃতীয় দিন, দশম দিন বা চল্লিশতম দিনে আলাদা করে অনুষ্ঠান করতে হবে। বরং এসব নির্দিষ্ট দিন-তারিখ নির্ধারণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজন করার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। আলেমদের একটি বড় অংশ মনে করেন, মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ এবং দোয়া করা একটি ব্যক্তিগত ও স্বতঃস্ফূর্ত আমল, যা যেকোনো সময় করা যায়, কোনো নির্দিষ্ট দিন বা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়।
হাদিসের আলোকে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মৃত্যুর পর সমবেত হয়ে খাবারের আয়োজনকে পছন্দনীয় কাজ হিসেবে দেখতেন না। বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে শোককে দীর্ঘায়িত করার একটি রীতি হিসেবে বিবেচিত হতো। দাফনের পর মৃতকে কেন্দ্র করে সমবেত হয়ে আনুষ্ঠানিক ভোজের আয়োজনকে তারা “বিলাপ” হিসেবে গণ্য করতেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। (মুসনাদে আহমদ ও ইবনে মাজাহ)
ইসলাম মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণকর কাজের যে পথ দেখিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো দোয়া করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের মৃতদের ভালো কাজের কথা আলোচনা করো এবং তাদের খারাপ কাজের আলোচনা থেকে বিরত থাকো।” (আবু দাউদ: ৪৯০০)। এটি প্রমাণ করে যে মৃত ব্যক্তির স্মরণে কল্যাণকর আলোচনা ও দোয়া করা উত্তম, কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা বা আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো সদকা বা দান করা। হজরত সাদ ইবনে উবাদা (রা.)-এর ঘটনায় রাসুল (সা.) অনুমতি দিয়েছিলেন মৃত মায়ের পক্ষ থেকে দান করার। (সহিহ বুখারি: ২৭৫৬)। এটি নির্দেশ করে যে মৃত ব্যক্তির জন্য উপকার করতে চাইলে সরাসরি দান-সদকা করা উত্তম পথ, যা কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান ছাড়াই করা যায়।
কবর জিয়ারতও ইসলামে অনুমোদিত একটি আমল, যা জীবিতদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আখিরাতের প্রতি মনোযোগ বাড়ায়। রাসুল (সা.) বলেন, “আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা জিয়ারত করো, কারণ এটি তোমাদের দুনিয়া বিমুখ করে এবং আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেয়।” (ইবনে মাজাহ: ১৫৭১)
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে মূল শিক্ষা হলো—মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণ কামনা করা, তার জন্য দোয়া করা এবং নিজের জীবনকে সংশোধন করা। কিন্তু মৃত্যুর নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে সামাজিক ভোজ, আনুষ্ঠানিকতা বা আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনকে অনেক আলেম ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন না। কারণ এতে অনেক সময় উদ্দেশ্য বদলে গিয়ে সামাজিক প্রতিযোগিতা, অপচয় এবং আর্থিক চাপ তৈরি হয়, যা ইসলামের সরলতার মূলনীতির পরিপন্থী।
তবে অনেক আলেম এটাও বলেন যে গরিব-মিসকিনকে খাওয়ানো বা দান করা যদি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয় এবং এতে কোনো নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে সেটি বৈধ হতে পারে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এটিকে বাধ্যতামূলক রীতিতে পরিণত করা হয় বা সামাজিক প্রতিযোগিতার অংশ বানানো হয়।
বর্তমান সময়ে অনেক পরিবারই সামাজিক চাপে পড়ে এসব আয়োজন করতে বাধ্য হন, যা আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম যেখানে সহজতা ও মধ্যপন্থার শিক্ষা দেয়, সেখানে অতিরিক্ত আড়ম্বর বা বাধ্যতামূলক রীতি ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে ইসলাম মৃত ব্যক্তির জন্য স্মরণ, দোয়া, দান এবং ভালো কাজের প্রচারকে উৎসাহিত করে। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনভিত্তিক কুলখানি বা চল্লিশার মতো আনুষ্ঠানিক আয়োজনকে বাধ্যতামূলক রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। বরং ধর্মীয় শিক্ষা হলো—সাদামাটা, আন্তরিক এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি-কেন্দ্রিক আমলই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।
মৃত্যুর বাস্তবতা আমাদের শেখায়, দুনিয়ার সব আয়োজন একদিন শেষ হয়ে যাবে। তাই জীবিতদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো নিজের আমল সংশোধন করা, মৃতদের জন্য দোয়া করা এবং আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা।