প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে একাধিক রাজনৈতিক জোটের মধ্যে যেমন প্রতিযোগিতা ও তৎপরতা দেখা গেছে, তেমনি শেষ মুহূর্তের আইনি জটিলতায় পড়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিশেষ করে একটি প্রার্থীর মনোনয়ন ঘিরে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা যায়, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে জোটের পক্ষ থেকে ১৩টি আসনের জন্য প্রার্থীদের তালিকা জমা দেওয়া হয়। তবে শেষ মুহূর্তে একজন প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠায় পুরো জোটের আসন বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জোটের একজন প্রার্থী এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের পর নির্ধারিত তিন বছরের সময়সীমা পূর্ণ না করেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কোনো সরকারি চাকরি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের পদ থেকে পদত্যাগ বা অবসরের পর সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে অন্তত তিন বছর সময় অতিক্রম করতে হয়। এই বিধান সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, নির্ধারিত সময়সীমা পূর্ণ না করলে কোনো ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারান। এই বিধান অনুসারে মনিরা শারমিনের প্রার্থিতা চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়ে গেছে।
জানা গেছে, তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত কৃষি ব্যাংক থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর ২০২৫-এ পদত্যাগ করেন। সেই অনুযায়ী তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় তার প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
একজন নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আইনি কাঠামোর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে পরিষ্কার হবে।
এদিকে এই পরিস্থিতিতে জোটের আসন বণ্টন নিয়েও নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। জানা যায়, জামায়াত জোটের জন্য বরাদ্দ ১৩টি আসনের মধ্যে কোনো প্রার্থিতা বাতিল হলে সেই আসন উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি হবে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনগুলো সাধারণত জোটের ভেতর সমঝোতার ভিত্তিতে ভাগ হয়ে থাকে। তাই একজন প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরো আসন সমীকরণে প্রভাব পড়ে। এই ক্ষেত্রে একটি আসন হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা জোটের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, যদি কোনো আসন শূন্য হয়ে যায় এবং পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন আয়োজন করা হয়, তবে সেই সুযোগে সংসদে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা রাজনৈতিক জোট সুবিধা নিতে পারে। এতে ক্ষমতাসীন বা প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক জোটের আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, সংরক্ষিত আসনের এই আইনি জটিলতা কেবল একটি প্রার্থীর বিষয় নয়, বরং এটি পুরো জোটের রাজনৈতিক কৌশলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে আরেকটি ঘটনা নিয়েও আলোচনা চলছে। জোটের পক্ষ থেকে নুসরাত তাবাসসুম নামে আরেকজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বিকেল ৪টার নির্ধারিত সময়ের পর জমা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তা সময় অতিক্রম হওয়ার বিষয়টি নথিভুক্ত করেছেন। ফলে তার মনোনয়ন গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সেটিও এখন অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
জোট সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, মনোনয়নপত্রগুলো আইনি কাঠামোর মধ্যে গ্রহণযোগ্য হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। তার মতে, শেষ মুহূর্তের কিছু প্রশাসনিক জটিলতা থাকলেও সমাধান সম্ভব।
অন্যদিকে প্রার্থী মনিরা শারমিন নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, তিনি যে পদে ছিলেন তা কোনো লাভজনক সরকারি পদ ছিল না এবং এটি বিশেষায়িত ব্যাংক হওয়ায় আইনি ব্যাখ্যায় ভিন্নতা থাকতে পারে। তার মতে, এটি সরাসরি নির্বাচনের বিষয় না হওয়ায় বিধান প্রয়োগে নমনীয়তা থাকা উচিত।
তবে নির্বাচন কমিশন সূত্র স্পষ্ট জানিয়েছে, আইনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে। কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তাই মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের পরই আসল চিত্র পরিষ্কার হবে।
রাজনৈতিক মহলে এখন অপেক্ষা চলছে আসন্ন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার দিকে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর ভবিষ্যৎ এবং জোটের আসন বণ্টনের চূড়ান্ত হিসাব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংরক্ষিত আসনের এই ধরনের আইনি জটিলতা ভবিষ্যতে প্রার্থিতা বাছাই প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা বাড়াবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই-বাছাই করতে হবে।
সব মিলিয়ে, একটি প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে সৃষ্ট এই জটিলতা এখন শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা জাতীয় রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে জোটের আসন ধরে রাখার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান।