প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শরীরে কৃমি সংক্রমণ একটি সাধারণ কিন্তু অবহেলিত স্বাস্থ্য সমস্যা, যা বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। অপরিচ্ছন্নতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব থেকেই মূলত এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃমি নিয়ে সমাজে এখনো অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যা অনেক সময় সঠিক চিকিৎসা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃমি কোনো আবহাওয়া বা মৌসুমি বিষয় নয়। বৃষ্টি হোক বা রোদ—সংক্রমণের মূল কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস। বিশেষ করে হাত না ধোয়া, নোংরা পানি পান করা, অপরিষ্কার খাবার গ্রহণ এবং খালি পায়ে টয়লেট ব্যবহার করার মতো অভ্যাস কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। কারণ তারা প্রায়ই মাটি, ধুলো বা নোংরা জিনিসের সংস্পর্শে আসে এবং হাত মুখে দেওয়ার অভ্যাস থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বড়রাও সচেতনতার অভাবে আক্রান্ত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃমি মূলত অন্ত্রে বাস করে এবং শরীরের ভেতর থেকে পুষ্টি শোষণ করে নেয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ধীরে ধীরে অপুষ্টি দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এ সমস্যা চলতে থাকলে শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়।
কৃমি সংক্রমণের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে পেট ফাঁপা, পেট ব্যথা, হজমের সমস্যা, আমাশয়ের মতো উপসর্গ, অস্বাভাবিক ক্লান্তি এবং শিশুদের ক্ষেত্রে পেট ফুলে যাওয়া। অনেক সময় শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, ওজন কমে যায় এবং তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে পায়ুপথে চুলকানি বা অস্বস্তিও দেখা দেয়।
চিকিৎসকরা আরও জানান, কৃমি শরীরে দীর্ঘদিন থাকলে রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে, যা শারীরিক দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অনেক সময় দেখা যায়, কৃমি সংক্রমণ নিয়ে সমাজে নানা ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, কৃমির ওষুধ খেলে শরীরে ক্ষতি হয় বা নির্দিষ্ট আবহাওয়ায় ওষুধ খেতে হয়। তবে চিকিৎসকরা এসব ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, কৃমির ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যেকোনো সময় গ্রহণ করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কৃমি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। খাবার গ্রহণের আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পরিষ্কার পানি পান করা, ধোয়া ছাড়া ফলমূল ও শাকসবজি না খাওয়া এবং খালি পায়ে মাটি বা টয়লেট ব্যবহার না করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
চিকিৎসকরা আরও বলেন, পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে একজনের সংক্রমণ থেকে পুরো পরিবারে কৃমি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ করা উচিত।
শিশু বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। সিরাপ বা ট্যাবলেট—যে কোনো ধরনের কৃমির ওষুধই সঠিক ডোজ ও নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রহণ করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, কৃমি শুধু একটি সাধারণ পেটের সমস্যা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টি ও দুর্বলতা শিশুদের ভবিষ্যৎ বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক সময় দেখা যায়, কৃমি সংক্রমণ গুরুতর হলে মাথা ঘোরা, খিঁচুনি বা স্নায়বিক সমস্যা পর্যন্ত দেখা দিতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা না নিলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতা ও নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কৃমি সংক্রমণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রতি তিন থেকে ছয় মাস পরপর পরিবারের সদস্যদের কৃমির ওষুধ গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে কৃমি সংক্রমণ একটি সহজেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অভিভাবকদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।
সব মিলিয়ে কৃমি সংক্রমণ একটি সাধারণ কিন্তু অবহেলিত স্বাস্থ্য সমস্যা হলেও সঠিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এটি সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।