প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকায় রেললাইন পারাপারের সময় ট্রেনের ধাক্কায় মো. আজমহল হোসাইন (৫৫) নামের এক পথচারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাটি এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে। ব্যস্ত নগর জীবনের মাঝেও রেললাইন পারাপারে অসতর্কতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি আবারও সামনে এনেছে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
নিহত আজমহল হোসাইন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার পান্তি গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় বসবাস করতেন এবং সদরঘাট এলাকার একটি পাইকারি পাঞ্জাবির দোকানে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে। প্রতিদিনের মতোই সকালে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তিনি, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানো আর সম্ভব হয়নি।
পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা যায়, সকালে নিজ ভাড়া বাসা থেকে বের হন আজমহল হোসাইন। উদ্দেশ্য ছিল সদরঘাটে নিজের কর্মস্থলে পৌঁছানো। পথিমধ্যে জুরাইন-দয়াগঞ্জ রেললাইন পার হওয়ার সময় কমলাপুরগামী একটি চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় তিনি ছিটকে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যেই গুরুতর আহত হন তিনি। আশপাশের লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন। তবে আঘাত ছিল অত্যন্ত গুরুতর। সকাল সোয়া ১০টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
নিহতের শ্যালক আব্দুল জলিল জানান, প্রতিদিনের মতোই তিনি সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। কোনোভাবেই তারা ভাবতে পারেননি এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। তিনি বলেন, “তিনি খুবই শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ঢাকায় কাজ করতেন। আজ সকালে বের হয়ে আর ফিরলেন না।”
ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা এবং রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানায় অবগত করা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এই দুর্ঘটনাটি রাজধানীর রেললাইন এলাকায় চলাচলের ঝুঁকি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। দয়াগঞ্জ, জুরাইন, কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ রেললাইন পারাপার করেন। নির্ধারিত ফুটওভার ব্রিজ বা নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও অনেকেই তা ব্যবহার না করে সরাসরি লাইন পার হন, যা প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়রা বলছেন, এ এলাকায় রেললাইন ঘেঁষে বসতি এবং দোকানপাট থাকায় মানুষের চলাচল বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় দ্রুতগতির ট্রেন আসার বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, শুধু সচেতনতা নয়, অবকাঠামোগত উন্নয়নও জরুরি। রেললাইন ঘেঁষে পর্যাপ্ত ব্যারিকেড, ফুটওভার ব্রিজের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানো না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে।
এদিকে, আজমহল হোসাইনের মৃত্যুর খবরে তার গ্রামের বাড়িতেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সেখানে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে।
রাজধানীর মতো ব্যস্ত শহরে প্রতিদিনই ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তবে রেললাইন দুর্ঘটনা যেন এক ভিন্ন ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ নয়, পথচারীদের আচরণগত পরিবর্তনও জরুরি। অন্যথায় এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা থামানো কঠিন হবে।
এই ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠছে—কতটা নিরাপদ রাজধানীর রেললাইন পারাপার ব্যবস্থা? একজন পরিশ্রমী মানুষের এমন অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকেই নয়, পুরো সমাজকেই নাড়া দিয়ে গেল।