কুড়িগ্রামে বিদ্যুৎহীনতায় চরম ভোগান্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৩ বার
কুড়িগ্রামে বিদ্যুৎহীনতায় চরম ভোগান্তি

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় টানা প্রায় তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শনিবার (২৫ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া এই সংকট সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুর পর্যন্তও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। ফলে দুই উপজেলার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক—সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং রোগী পরিবহন পর্যন্ত সবাই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার থেকেই হঠাৎ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমদিকে মাঝে মাঝে অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ এলেও তা স্থায়ী হয়নি। রবিবার রাতে মাত্র ৪৫ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ ফিরে এলেও এরপর আবারও পুরো অঞ্চল অন্ধকারে তলিয়ে যায়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংকট চলমান রয়েছে।

এদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় সীমিতভাবে একটি-দুটি মোবাইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নেটওয়ার্ক দিলেও অধিকাংশ এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ। স্থানীয়রা বলছেন, জরুরি ফোন কল করা বা অনলাইনে কোনো কাজ করাও এখন সম্ভব হচ্ছে না।

রৌমারী উপজেলার বাসিন্দা আবু হানিফ বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে দিনে-রাতে মিলিয়ে মোটে এক ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তাও আবার হঠাৎ চলে যায়। আমরা কার্যত বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।” তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হলেও মাস শেষে অতিরিক্ত বিল আসছে, যা তাদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

একই এলাকার আরেক বাসিন্দা আরিফ হাসান জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আমরা অনলাইনে কোনো কাজ করতে পারছি না। গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি সংকটও চলছে। ফলে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাটারিচালিত অটো ও ইজিবাইকগুলো চার্জ দিতে না পারায় রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা খুবই কম।”

স্থানীয় পরিবহন চালক রবিউল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় তার আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আগে দিনে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় হতো, এখন দিনে ১৫০-২০০ টাকাও হয় না। ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় গাড়ি চালাতে পারছি না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”

শিক্ষার্থীরাও এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়ছে চরম বিপাকে। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। আবার অনেকে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় ঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারছে না। পরীক্ষার দিনে পরিবহন সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন অভিভাবক জানান, “আমার সন্তান এসএসসি পরীক্ষার্থী। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঠিকমতো পড়তে পারছে না। আবার পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হলে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সাধারণ সময়ের তুলনায় এখন দুই থেকে তিনগুণ বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে।”

শুধু শিক্ষার্থী নয়, সাধারণ রোগী পরিবহনও কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমিত সংখ্যক যানবাহনের কারণে জরুরি প্রয়োজনে রোগী আনা-নেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। রৌমারীর চরশৌলমারী বাজার এলাকার ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট শহিদুল ইসলাম বলেন, টানা ৭২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকিং লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। গ্রাহকরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে বাজার কার্যত স্থবির। অনেক দোকানে বিক্রি কমে গেছে, আবার কিছু দোকান পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

আরও জানা গেছে, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কিছু এলাকায় জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তেল পাম্প বন্ধ থাকায় যানবাহনের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যা পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও অচল করে দিয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। রৌমারী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা রাফিউর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও লোডশেডিং সমস্যার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হবে।

অন্যদিকে রাজিবপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা সায়েকুল হাসান খান জানান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।

তবে স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে এমন সংকট চললেও কার্যকর কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না। অনেকে বলছেন, শুধু আশ্বাস নয়, এখন বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এতে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এই দীর্ঘ বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্নতা শুধু দৈনন্দিন জীবনকেই নয়, পুরো এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমকে থমকে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় এ ধরনের অবস্থা চলতে থাকলে স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার এই অচলাবস্থা এখন স্থানীয়দের জন্য এক বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত