পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণে পরিষ্কার বার্তার দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার
পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণে পরিষ্কার বার্তার দাবি

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একীভূতকরণ প্রক্রিয়াধীন পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট। ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যা ও সংশোধন ঘিরে আমানতকারী থেকে শুরু করে প্রশাসক পর্যায় পর্যন্ত সবাই এখন স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অপেক্ষায়। এই পরিস্থিতিতে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে লিখিত ও পরিষ্কার নির্দেশনার দাবি জানিয়েছেন।

রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রশাসকরা চলমান পরিস্থিতি, আমানতকারীদের উদ্বেগ এবং ব্যাংকগুলোর বাস্তব অবস্থা তুলে ধরেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা জানান, একীভূত ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ কাঠামো এবং আগের মালিকানা কাঠামো পুনর্বহালের সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা এখন আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছর ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আওতায় শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক” গঠন করে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রশাসক নিয়োগ দেয় এবং তাদের সহায়তায় বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তবে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এ যুক্ত হওয়া ১৮(ক) ধারা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, একীভূত ব্যাংকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যে মূলধন দিয়েছে, তার নির্দিষ্ট অংশের বিনিময়ে আগের মালিকরা আবারও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এই বিধান ঘোষণার পর থেকেই ব্যাংক খাতের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের আলোচনা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে অর্থ তুলতে না পারা অনেক গ্রাহক একদিকে যেমন আতঙ্কিত, অন্যদিকে তেমনি আস্থাহীনতায় ভুগছেন। কেউ কেউ কেবল মূল টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য আবেদন করছেন, আবার কেউ আগের মতো মুনাফা না পেলেও মূলধন ফেরত চাচ্ছেন। ব্যাংক খাতের এই অনিশ্চয়তা এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পর্যায়েও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বৈঠকে প্রশাসকরা গভর্নরকে জানান, একীভূত ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন আমানত আসছে না, এমনকি আগে যে সীমিত পরিমাণ ঋণ পরিশোধ হচ্ছিল তাও এখন প্রায় বন্ধের পথে। ফলে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে আরও গভীরভাবে নিমজ্জিত হচ্ছে। প্রশাসকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পুরো প্রক্রিয়া বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।

এ সময় প্রশাসকরা আরও বলেন, ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের নতুন ধারা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় গ্রাহক ও বাজার উভয়ের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। যদি আগের মালিকদের পুনরায় ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তাদের দায়-দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার নীতিগত অবস্থান জরুরি।

সূত্র জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেননি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যেভাবে এগোবে, সেভাবেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এই বক্তব্য প্রশাসকদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে জানা গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক খাতে আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একবার আস্থার সংকট তৈরি হলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করার পর যদি নীতিগত অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে সেটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকে বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে প্রদান করেছে। আমানত বীমা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত গ্রাহকদের ফেরত দিতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার। ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি, যার মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা প্রায় ৮৪ শতাংশের কাছাকাছি। পুরো ব্যাংক খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি, সেখানে এই ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক।

মূলধন ঘাটতির দিক থেকেও এই ব্যাংকগুলো বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তার একটি বড় অংশ এই পাঁচ ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত নীতি ঘোষণা। একীভূত ব্যাংকগুলোকে ঘিরে যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা স্পষ্ট না করা হয়, তাহলে এটি শুধু ব্যাংক খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে।

বর্তমানে আমানতকারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন তাদের জমাকৃত অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে। একই সঙ্গে ব্যাংক প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সমন্বিত ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না এলে এই অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ এখন একটি জটিল নীতিগত ও অর্থনৈতিক পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আস্থা, স্বচ্ছতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত