নেত্রকোনায় বজ্রপাতে দুইজনের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার
নেত্রকোনা বজ্রপাতে মৃত্যু খবর

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলায় বজ্রপাতে দুইজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই দিনে পৃথক দুটি ঘটনায় ধনু নদীতে মাছ ধরার সময় এবং হাওর থেকে গরু আনতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। আকস্মিক বজ্রপাতের এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে, তবে এবার দুইটি পৃথক স্থানে একই দিনে প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ঘটনাটি ঘটে সোমবার দুপুরে খালিয়াজুরী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। প্রথম ঘটনায় কিশোরগঞ্জ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মোতালিব মিয়া (৫৫) ধনু নদীর গোদারাঘাট এলাকায় মাছ ধরতে যান। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের মতো তিনি বরশি দিয়ে মাছ ধরছিলেন। হঠাৎ আকাশে কালো মেঘ জমে প্রচণ্ড বজ্রপাত শুরু হলে মুহূর্তের মধ্যেই তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে একই উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের সাতগাঁও গ্রামে আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। ওই গ্রামের নেকবর খাঁর ছেলে মোনায়েম খাঁ ওরফে হালান (৫০) বাড়ির পাশের হাওর থেকে গরু আনতে গিয়েছিলেন। হাওরের বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় হঠাৎ বজ্রপাত শুরু হলে তিনি নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসলেও তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খালিয়াজুরী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পরবর্তীতে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনার পরপরই এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং দুই পরিবারের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়।

খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বজ্রপাতের সময় উভয় ব্যক্তি খোলা জায়গায় ছিলেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আকস্মিক বজ্রপাতের তীব্রতায় তারা ঘটনাস্থলেই মারা যান। তিনি আরও জানান, হাওর ও নদী এলাকায় বজ্রপাতের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের শুরুতে এ ধরনের দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খালিয়াজুরী ও আশপাশের হাওরাঞ্চলে কৃষি ও মৎস্যনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে অনেকেই প্রতিদিন খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। মাছ ধরা, গবাদি পশু আনা-নেওয়া কিংবা কৃষিকাজের সময় হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এ কারণে বজ্রপাতের সময় দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হলেও অনেক সময় তা সম্ভব হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, নদীবেষ্টিত এলাকা এবং উন্মুক্ত মাঠে কাজ করা মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের ঘনত্ব ও তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ জনজীবনে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময়টি বজ্রপাতের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে শক্তিশালী বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাই এ সময় খোলা মাঠ, নদী বা হাওরে অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

নেত্রকোনার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় বজ্রনিরোধক আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা উল্লেখ করেন। বিশেষ করে কৃষক ও জেলেদের জন্য আলাদা সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ ঘটনায় নিহত দুই পরিবারের মধ্যে গভীর শোক বিরাজ করছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, দুজনই ছিলেন পরিশ্রমী ও পরিবারনির্ভর মানুষ। তাদের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারগুলো বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বজ্রপাতজনিত দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা প্রচার, স্থানীয় পর্যায়ে মাইকিং ব্যবস্থা এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হলে এ ধরনের প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

নেত্রকোনার এই দুইটি মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিলো, প্রকৃতির আকস্মিক পরিবর্তন কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং তা থেকে বাঁচতে সচেতনতা ও সতর্কতা কতটা জরুরি। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনে প্রকৃতি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি তা কখনো কখনো হয়ে ওঠে ভয়াবহ বিপদের কারণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত