প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডায়াবেটিস এখন বিশ্বজুড়ে একটি নীরব মহামারি হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশেও এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় না, বরং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুতর সমস্যা হলো শরীরের ক্ষত বা আঘাত দ্রুত না শুকানো। অনেক ক্ষেত্রে ছোট একটি কাটা বা ক্ষতও বড় ধরনের জটিলতায় রূপ নিতে পারে, যা রোগীর জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে ক্ষত সারতে দেরি হওয়ার পেছনে একাধিক জটিল কারণ কাজ করে। প্রথমত, রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে শরীরের রক্তনালীগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে পা ও হাতের প্রান্তে পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়। ক্ষতস্থানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান না পৌঁছালে নতুন কোষ তৈরি হতে পারে না, যা ক্ষত শুকানোর প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
এর পাশাপাশি ডায়াবেটিস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়। সুস্থ মানুষের শরীর যেখানে সহজেই ব্যাকটেরিয়া বা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে, সেখানে ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ক্ষতস্থানে সহজেই সংক্রমণ হয় এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। অনেক সময় এই সংক্রমণ এতটাই মারাত্মক হয় যে অস্ত্রোপচার বা অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন পর্যন্ত দেখা দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো স্নায়ুর ক্ষতি বা নিউরোপ্যাথি। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রে স্নায়ু ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে করে অনেক সময় শরীরের কোনো অংশে ব্যথা বা আঘাত লাগলেও তা অনুভব করা যায় না। ফলে রোগী বুঝতেই পারেন না যে কোথাও ক্ষত তৈরি হয়েছে। এই অবহেলার কারণে ক্ষত আরও গভীর হয় এবং পরে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিশেষ করে পায়ের যত্ন নেওয়া ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ পায়ে ক্ষত হলে তা অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে এবং দ্রুত সংক্রমিত হয়। এজন্য প্রতিদিন নিজের পা ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত। কোথাও কাটা, ফোসকা বা লালচে দাগ দেখা গেলে তা গুরুত্ব সহকারে নেওয়া প্রয়োজন।
ক্ষত সারাতে দেরি হওয়ার এই সমস্যা এড়াতে হলে প্রথমেই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শর্করার মাত্রা যত বেশি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ততই ক্ষত দ্রুত শুকানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
এছাড়া কোনো ক্ষত হলে তা অবহেলা না করে দ্রুত পরিষ্কার করা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করে ক্ষত পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। অনেক সময় ছোট ক্ষতও বড় সংক্রমণে পরিণত হতে পারে, তাই শুরু থেকেই সতর্কতা জরুরি।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দিচ্ছেন, ডায়াবেটিক রোগীদের সবসময় আরামদায়ক ও পরিষ্কার জুতা পরা উচিত এবং খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ ছোট কোনো পাথর বা ধারালো বস্তু পায়ে লাগলেও তা অনুভব নাও হতে পারে, যা পরে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশেও কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাও এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা সবচেয়ে বড় অস্ত্র। রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে এবং নিয়ম মেনে চললে অনেক জটিলতা সহজেই এড়ানো সম্ভব। কিন্তু অবহেলা করলে ছোট একটি ক্ষতও জীবননাশের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে অনেক মানুষ এখনো ডায়াবেটিসকে ততটা গুরুত্ব দেন না, যার ফলে তারা জটিল অবস্থায় গিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
সবশেষে চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কোনো ক্ষতই ছোট নয়। প্রতিটি ক্ষতই গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। দ্রুত চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।