২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াল স্মৃতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৮২ বার
ভয়াল সেই ২৯ এপ্রিলের স্মৃতি

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ অধ্যায়, ১৯৯১ সালের এই দিনে আঘাত হেনেছিল বিধ্বংসী এক ঘূর্ণিঝড়, যা উপকূলীয় জনপদকে পরিণত করেছিল ধ্বংসস্তূপে। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় উপকূলবাসীকে। স্বজন হারানোর বেদনা, নিঃস্বতার যন্ত্রণা এবং প্রকৃতির নির্মম সেই রূপ আজও অনেকের মনে জীবন্ত।

১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসের শেষদিকে বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়, যা দ্রুতই শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ এপ্রিল সেটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ২৮ ও ২৯ এপ্রিলের মধ্যে এটি ভয়ংকর শক্তিতে পরিণত হয়, যার গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ মাইল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অবশেষে ২৯ এপ্রিল রাতে এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূলে আছড়ে পড়ে, যার স্থলভাগে আঘাতের সময় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৫৫ মাইল। ইতিহাসে এটি ঘূর্ণিঝড় ‘গোর্কি’ নামে পরিচিত।

ঘূর্ণিঝড়টি যখন উপকূলে আঘাত হানে, তখন রাতের অন্ধকারে এক ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস গ্রাস করে নেয় পুরো অঞ্চলকে। ১০ থেকে ২৫ ফুট উচ্চতার ঢেউ মুহূর্তেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, ভাসিয়ে নেয় ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসলের জমি এবং মানুষের জীবন। এক রাতেই বদলে যায় হাজারো মানুষের ভাগ্য।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে অন্তত ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন মানুষ প্রাণ হারান, আহত হন সমসংখ্যক মানুষ। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সূত্র এবং সংবাদমাধ্যমের মতে, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ২ লাখেরও বেশি হতে পারে। শুধু মৃত্যু নয়, কোটি মানুষ হয়ে পড়ে গৃহহীন, হাজার হাজার পরিবার হারিয়ে যায় এক নিমেষে।

ক্ষতির পরিমাণও ছিল বিপুল। প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়, যা সে সময় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভোলা, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ, খেপুপাড়া এবং হাতিয়া অঞ্চল। এসব এলাকার অনেক গ্রাম মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে যায়।

চট্টগ্রাম নগরীতেও সেদিনের ক্ষয়ক্ষতি ছিল ভয়াবহ। হালিশহর, আগ্রাবাদ, বন্দর, পতেঙ্গা ও কাটঘর এলাকায় জলোচ্ছ্বাসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। নোঙর করা জাহাজগুলো ছিটকে পড়ে, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সদস্য পরিবারসহ ঘুমন্ত অবস্থায় পানির তোড়ে ভেসে যান, যাদের অনেকেরই আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে এক ভয়াবহ চিত্র। কেউ সন্তানকে হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন পুরো পরিবার। অনেক এলাকায় একসঙ্গে গোটা গ্রামই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সেই রাতের বিভীষিকা আজও উপকূলবাসীর মনে দুঃস্বপ্নের মতো ফিরে আসে।

ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা দেওয়া হলেও অনেক মানুষ তা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। আবার অনেক এলাকায় সেই সময় পর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বার্তা পৌঁছায়নি। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে না পারায় প্রাণহানির সংখ্যা এত বিপুল হয়ে ওঠে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

সেই ভয়াবহ ঘটনার পর বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি ও সতর্কতা ব্যবস্থায় অনেক উন্নতি হয়েছে। তৈরি হয়েছে অসংখ্য আশ্রয়কেন্দ্র, উন্নত করা হয়েছে আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনও পুরো উপকূলীয় অঞ্চল ঝুঁকিমুক্ত নয়।

কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, টেকনাফসহ বহু এলাকায় এখনো ভাঙা ও দুর্বল বেড়িবাঁধ রয়েছে। সামান্য ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসেই এসব এলাকায় পানির ঢল প্রবেশ করে। ফলে লাখো মানুষ এখনো প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।

প্রতি বছর ২৯ এপ্রিল এলেই উপকূলের মানুষ ফিরে যান সেই ভয়াল স্মৃতিতে। কোথাও দোয়া মাহফিল, কোথাও আলোচনা সভা, আবার কোথাও নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর জন্য এটি শুধু একটি দিন নয়, বরং এক চিরস্থায়ী বেদনার প্রতিচ্ছবি।

পরিবেশবিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এমন ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই উপকূলীয় সুরক্ষা, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।

৩৫ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের স্মৃতি এখনো উপকূলের মানুষের মনে জীবন্ত। ভয়াল সেই ২৯ এপ্রিল শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলার ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের অসহায়ত্ব এবং প্রস্তুতির গুরুত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com