প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বাড়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক এবং অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই জ্বর, র্যাশ, ডায়ারিয়া ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নিয়ে অসংখ্য শিশু ভর্তি হচ্ছে। তবে বাস্তব চিত্রের তুলনায় নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা এখনো অনেক কম। কারণ, দেশে হামের নমুনা পরীক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাসে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে আড়াইশোর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে মাত্র ৪৭ জনের ক্ষেত্রে। একইভাবে, চলতি বছরজুড়ে প্রায় ৩৫ হাজার সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হলেও পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হাম পাওয়া গেছে প্রায় ৫ হাজার জনের শরীরে। এই পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে বর্তমানে কেবল রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও এবং হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরিতেই হামের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। একটি মাত্র পরীক্ষাগারের ওপর পুরো দেশের নির্ভরশীলতা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নমুনা পরীক্ষার পরিধি সীমিত থাকায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা অনেকাংশেই অজানা থেকে যাচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ৩৫ শতাংশে হাম পজিটিভ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এপ্রিল মাসে সেই হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থাৎ সংক্রমণের গতি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রেই নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জ্বর, র্যাশ, কাশি ও ডায়ারিয়ার মতো উপসর্গ দেখেই চিকিৎসা শুরু করতে হচ্ছে।
রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে যে শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে তাদের অনেকের মধ্যেই হামের সাধারণ উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। নমুনা পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় চিকিৎসকরা উপসর্গ বিবেচনায় সন্দেহজনক হাম ধরে চিকিৎসা দিচ্ছেন। পরে অন্য কোনো জটিলতা ধরা পড়লে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা পরিবর্তন করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সময়মতো রোগ নির্ণয় না হলে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় জটিলতা দ্রুত বাড়ে এবং অনেক সময় প্রাণহানিও ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে পরিচালিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাগ্রহণে অনীহা, সচেতনতার অভাব এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম টিকা না পাওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
তারা আরও বলছেন, শুধুমাত্র রাজধানীকেন্দ্রিক পরীক্ষাব্যবস্থা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে হামের নমুনা পরীক্ষার সুবিধা চালু করা জরুরি। একইসঙ্গে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন, যাতে স্থানীয় হাসপাতালগুলো দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম সাধারণত একটি ভাইরাসজনিত রোগ হলেও এর জটিলতা অনেক ভয়াবহ হতে পারে। নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়ারিয়া, পানিশূন্যতা, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এদিকে বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, শিশুর জ্বর ও র্যাশ শুরু হওয়ার পর দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা না পেয়ে রাজধানীতে ছুটে আসতে হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তারা দ্রুত গণসচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আরও সক্রিয় করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। শিশুর জ্বর, শরীরে লালচে র্যাশ, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা ডায়ারিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একইসঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে কিছুটা আলাদা রাখার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে, যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, নিশ্চিত শনাক্তের তুলনায় বাস্তব আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো গেলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশে অতীতে সফল টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই সংক্রমণ পরিস্থিতি নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সচেতনতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।