অর্থ বিভাগের অনুমোদন ছাড়া নতুন প্রকল্পে কঠোর নিষেধাজ্ঞা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪৪ বার
নতুন প্রকল্প অনুমোদন বাধ্যতামূলক

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় নতুন প্রকল্প গ্রহণ কিংবা আর্থিক প্রভাব রয়েছে এমন যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ-২ থেকে জারি করা সাম্প্রতিক এক পরিপত্রে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার জারি করা ওই পরিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন যুগ্মসচিব কাউসার নাসরী। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অনেক সময় অর্থ বিভাগের আনুষ্ঠানিক মতামত ছাড়াই বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, হাসপাতাল স্থাপন, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা অন্যান্য উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সরকারের ওপর স্থায়ী আর্থিক দায় সৃষ্টি করছে এবং তা বিদ্যমান আর্থিক বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অর্থ বিভাগের এই নির্দেশনা মূলত সরকারি ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং অপ্রত্যাশিত বাজেট ঘাটতি প্রতিরোধের লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পরিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬-এর রুল-১৩ অনুযায়ী অর্থ বিভাগের সঙ্গে পূর্বপরামর্শ ছাড়া কোনো মন্ত্রণালয় অনুমোদিত বাজেটের বাইরে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা আদেশ জারি করতে পারবে না, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের আর্থিক বিষয়ে প্রভাব ফেলে।

এছাড়া সচিবালয় নির্দেশমালা ২০২৪-এর নির্দেশনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সঙ্গে পরামর্শের ক্ষেত্রে রুলস অব বিজনেসের বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ আর্থিক দায় তৈরি করতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অর্থ বিভাগের মতামত নেওয়া এখন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নতুন অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক বিশ্লেষণ ছাড়াই উদ্যোগ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সরকারের পরিচালন ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নতুন প্রতিষ্ঠান চালু হলে জনবল নিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও তার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে পরে সরকারের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি এবং বাজেট ঘাটতির মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এ অবস্থায় সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আর্থিক দায় এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।

পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন ছাড়া গৃহীত পদক্ষেপ রুলস অব বিজনেসের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে সরকারের পরিচালন ব্যয় অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বাজেট ঘাটতির ঝুঁকিও বাড়ে। তাই ভবিষ্যতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এ বিষয়ে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘাটতির কারণে অনেক প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদনের আগে সম্ভাব্য পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে প্রকল্প চালু হওয়ার পর বাড়তি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হয়েছে। নতুন নির্দেশনা সেই অনিয়ম কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, শুধু অনুমোদনের বিধান জোরদার করলেই হবে না, বরং প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ব্যয় বিশ্লেষণও আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ অনেক সময় প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তব ব্যয় পূর্বানুমানের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, পরিপত্রটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এটি বহাল থাকবে। সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে আর্থিক প্রভাবসম্পন্ন যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অর্থ বিভাগের মতামত গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপকে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত কাঠামো গড়ে তোলার অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গা থেকে এই নির্দেশনা ভবিষ্যৎ বাজেট পরিকল্পনা ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com