প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ঘিরে ওঠা একাধিক অভিযোগ ও মন্তব্য। গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমান বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নাহিদ ইসলামকে নিয়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন তুলেছেন। তার ওই পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে রাশেদ খাঁন দাবি করেন, নাহিদ ইসলাম সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও দায়িত্ব পালনকালে তার ভূমিকা ও সিদ্ধান্তের কারণে নৈতিক দায় এড়াতে পারেন না। তার এই বক্তব্য প্রকাশের পর বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
রাশেদ খাঁন তার পোস্টে দাবি করেন, সংসদে দাঁড়িয়ে নাহিদ ইসলাম একবার দুর্নীতির প্রমাণ চাওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তবে তার ভাষায়, সেই বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তব পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির বাণিজ্য ও প্রভাব খাটানোর ঘটনা ঘটেছে এবং সেই প্রেক্ষাপটে নাহিদ ইসলামের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নাহিদ ইসলামের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী (পিও) আতিক মোর্শেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গণমাধ্যমে নানা ধরনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। এসব ঘটনায় সরাসরি দায় না থাকলেও নৈতিকভাবে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভূমিকা প্রশ্নের বাইরে থাকতে পারে না—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
রাশেদ খাঁন তার পোস্টে আরও দাবি করেন, নাহিদ ইসলাম বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজের ঘনিষ্ঠজনদের নিয়োগে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বাইরে অন্য দপ্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তার প্রভাব ছিল—এমন কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রমাণের কথা তিনি উল্লেখ করেননি।
তিনি আরও বলেন, নাহিদ ইসলাম নিজেই একসময় মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি কিছু উপদেষ্টাকে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়েছেন। সেই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে, যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের দায় কতটা—সেই প্রশ্নও তোলেন রাশেদ খাঁন।
তার পোস্টে আরও বলা হয়, নাহিদ ইসলাম একাধিকবার দাবি করেছিলেন যে বিভিন্ন ধনী ব্যক্তি এনসিপিকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন। এই অর্থায়নের উৎস ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, রাজনৈতিক দল বা সংগঠনে অর্থ সহায়তার বিষয়টি স্বচ্ছ না হলে তা ভবিষ্যতে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
সবচেয়ে আলোচিত অংশে রাশেদ খাঁন অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিনকে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি অনুযায়ী, এমন একজন ব্যক্তিকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো এবং তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটি নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নাহিদ ইসলাম তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। পাশাপাশি তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পর যাকে দায়িত্ব দিয়ে যান, সেই সময়ে কিছু গণমাধ্যম লাইসেন্স প্রদান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাশেদ খাঁন তার পোস্টে আরও দাবি করেন, নাহিদ ইসলাম বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া উন্নয়নের অঙ্গীকার নিয়ে সরকারে যুক্ত হলেও সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি এবং পরে তিনি পদত্যাগ করেন। এই ধারাবাহিকতায় তিনি নাহিদ ইসলামকে সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে না জড়ালেও নৈতিক দায়ের প্রশ্নে চ্যালেঞ্জ করেন।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক এই বক্তব্য ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া মূলত চলমান রাজনৈতিক সমীকরণেরই একটি অংশ। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির উত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, এই মন্তব্যগুলো সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
অন্যদিকে নাহিদ ইসলাম বা এনসিপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ফলে বিষয়টি একতরফা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। তবে সেখানে প্রকাশিত মন্তব্য অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে নাহিদ ইসলামকে ঘিরে রাশেদ খাঁনের মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমার মধ্যেই থেকে যাচ্ছে, নাকি আইনি বা প্রশাসনিক পর্যায়ে গড়ায়—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আপাতত এই ইস্যু ঘিরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, এবং ভবিষ্যতে দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।