মার্কিন অবরোধে ইরানের তেল খাত কতটা চাপে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
মার্কিন অবরোধ কি ইরানের তেল উৎপাদন থামাতে পারবে?

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অর্থনৈতিক ও নৌ অবরোধের মুখে ইরানের তেল রপ্তানি ও উৎপাদন ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই কঠোর চাপ কি সত্যিই ইরানের তেল উৎপাদন পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারবে, নাকি এটি ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেবে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেছেন, মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও দেশের তেল খাতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি। তার মতে, ইরান অন্তত আগামী এক মাস অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখে এবং উৎপাদন ব্যবস্থা এখনও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। তাদের দাবি, অবরোধ ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে এবং ইরানের তেল রপ্তানি সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রপ্তানি বন্ধ হলে ইরানকে উৎপাদিত তেল সংরক্ষণ করতে হবে, যা একসময় স্টোরেজ সীমা পূর্ণ করে উৎপাদন হ্রাস বা বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতামত ভিন্নমাত্রার। তাদের মতে, তেল উৎপাদন হঠাৎ বন্ধ করা হলে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং ভূগর্ভস্থ তেল রিজার্ভের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এতে ভবিষ্যতে তেল উত্তোলন প্রক্রিয়া আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অবরোধ শুরুর পর ইরানের তেল মজুদ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে খারগ দ্বীপে, যা দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেখানে স্টোরেজ ট্যাংকগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সেখানে মজুদ প্রায় ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল শিল্প সাধারণত নিরাপত্তা ও কার্যক্রমের কারণে স্টোরেজ ৮০ শতাংশের বেশি পূর্ণ রাখতে চায় না। সেই সীমা অতিক্রম করলে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়, যা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

ইতিহাসেও দেখা গেছে, ইরান আগেও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। কোভিড মহামারির সময় ২০২০ সালে খারগ দ্বীপের তেল মজুদ প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যা সেই সময়ের জন্য একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছিল।

জ্বালানি বিশ্লেষক মুইউ জু মনে করেন, বর্তমান অবরোধ হঠাৎ কোনো ধস তৈরি করবে না বরং ধীরে ধীরে উৎপাদন হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে। তার মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ স্টোরেজে বর্তমানে প্রায় ২০ দিনের উৎপাদন ধারণক্ষমতা রয়েছে, যা সাময়িকভাবে চাপ সামলাতে সাহায্য করছে।

তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে তবে আগামী মাসগুলোতে বিশেষ করে মে মাসের দিকে উৎপাদন হ্রাসের গতি আরও বাড়তে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ইরানের জ্বালানি খাত দেশটির অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। তাই এই খাতে যেকোনো চাপ সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। অবরোধের কারণে রপ্তানি সীমিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মতে, অবরোধের মূল উদ্দেশ্য দ্রুত উৎপাদন বন্ধ করা নয়, বরং ধাপে ধাপে চাপ সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করা, যাতে কূটনৈতিক আলোচনার পথ তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সরাসরি সামরিক বা হঠাৎ অর্থনৈতিক পতনের চেয়ে ধীরগতির চাপই বেশি কার্যকর হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারেও এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে। তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বৈশ্বিক বাজারে মূল্য ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। অনেক দেশই এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ইরান সরকার দাবি করছে, তারা বিকল্প বাজার ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে অবরোধের চাপ অর্থনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিন্ন মত হলো, মার্কিন অবরোধ ইরানের তেল উৎপাদন তাৎক্ষণিকভাবে থামিয়ে দিতে সক্ষম নয়। তবে এটি ধীরে ধীরে উৎপাদন ও রপ্তানিতে চাপ সৃষ্টি করে একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব শুধু ইরানেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত