বিদায় ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’: হেভি মেটালের কিংবদন্তি ওজি অসবোর্ন আর নেই

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০২৫
  • ৭১ বার
বিদায় ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’: হেভি মেটালের কিংবদন্তি ওজি অসবোর্ন আর নেই

প্রকাশ: ২৩শে জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্ব সংগীত অঙ্গনের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী চরিত্র, হেভি মেটালের জাদুকর ওজি অসবোর্ন প্রয়াত হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাতের এক নিঃসঙ্গ মুহূর্তে থেমে গেছে এই কিংবদন্তির জীবনযাত্রা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। বিশ্ববাসীর কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ নামে, তবে সঙ্গীতের অন্ধকার সৌন্দর্যকে তিনি যেভাবে মহিমান্বিত করেছেন, তা তাকে এনে দিয়েছে অমরত্বের এক আসন।

ওজির পরিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছে, প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ও ভালোবাসায় বেষ্টিত হয়েই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরিবার এই শোকের সময়ে সবার কাছ থেকে গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ করেছে। যদিও মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি, তবে ওজির দীর্ঘদিন ধরে চলা শারীরিক অসুস্থতা এবং পারকিনসন্স রোগের বিষয়টি আগে থেকেই পরিচিত ছিল তার ভক্তদের কাছে।

১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে গড়ে ওঠা ‘ব্ল্যাক সাবাথ’ ব্যান্ডের মাধ্যমে অসবোর্ন গানে এনেছিলেন এমন এক বৈপ্লবিক ঘরানা, যা পরে ‘হেভি মেটাল’ নামে পরিচিতি পায়। গিটারিস্ট টনি ইয়োমি, বেসিস্ট গিজার বাটলার এবং ড্রামার বিল ওয়ার্ডের সঙ্গে মিলে অসবোর্ন তৈরি করেন এমন এক ধ্বনিচিত্র, যা রক সঙ্গীতের ইতিহাস বদলে দেয়। ‘আয়রন ম্যান’, ‘প্যারানয়েড’, ‘মাস্টার অব রিয়েলিটি’—এসব গান কেবল জনপ্রিয়ই হয়নি, এগুলো হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহী যুবসমাজের আত্মঘোষণা।

১৯৭৮ সালে ব্যান্ড থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর শুরু করেন নিজের একক সংগীতজীবন। ‘ব্লিজার্ড অব অজ’ এবং ‘ডায়েরি অব আ ম্যাডম্যান’-এর মতো অ্যালবাম তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। সেই সময় তার ‘ক্রেজি ট্রেইন’ গানটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু শিল্পীর প্রেরণায় পরিণত হয়।

কিন্তু ওজির জীবন কেবল সংগীতের উত্থান-পতনের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল না। ছিল বিতর্ক, উন্মাদনা আর অন্ধকার। মঞ্চে জীবন্ত বাদুড়ের মাথা কামড়ে দেওয়ার কাহিনী কিংবা মাদকাসক্তি ও মদ্যপানজনিত নানা কেলেঙ্কারি তাকে বিতর্কিত করে তোলে। ব্যক্তিজীবনে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী শ্যারনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে ছয় মাস কাটাতে হয় পুনর্বাসন কেন্দ্রে। তবে শ্যারনের ক্ষমায় সে সম্পর্ক টিকে যায় এবং পরবর্তী সময়ে এমটিভি-র জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘দ্য অসবোর্ননাস’-এর মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে তার এক ভিন্ন পরিচয় সামনে আসে।

২০২০ সালে অসবোর্ন নিজেই প্রকাশ করেন যে তিনি পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত। তার শরীর আর সহ্য করতে পারছিল না দীর্ঘ সংগীতজীবনের ক্লান্তি। ২০২২ সালে বার্মিংহামে কমনওয়েলথ গেমসের সমাপনী অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর থেকে মঞ্চের আলো থেকে দূরে থাকলেও বিদায় জানাতে তিনি থেমে থাকেননি। ২০২৫ সালের ৫ জুলাই, বার্মিংহামের অ্যাস্টন এলাকার ভিলা পার্ক স্টেডিয়ামে বসে জীবনের শেষ কনসার্টে গান করেন তিনি। কালো সিংহাসনে বসা, চোখে তার চিরচেনা বিদ্রোহী দৃষ্টি, শেষবারের মতো ভক্তদের দিকে হাত নাড়লেন তিনি—এই দৃশ্য আজও ভক্তদের স্মৃতিতে গেঁথে আছে।

ওজির মৃত্যুর খবরে বিশ্বজুড়ে সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রোলিং স্টোনসের রোনি উড, মেটালিকা, ভ্যান হ্যালেনের স্যামি হ্যাগার, কুইনের ব্রায়ান মে, এলটন জন, গ্রিন ডে-র ব্রায়ান জো—অনেকেই তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এলটন জন বলেন, “ওজি ছিলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের একজন, একজন সংগীতযোদ্ধা। তিনি গানের দেবতাদের অমর তালিকায় চিরকাল জায়গা করে নিয়েছেন।”

জন মাইকেল অসবোর্ন নামের যে তরুণ ছেলেটি ১৫ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল, চুরি করে জেলে গিয়েছিল, আজ সেই ছেলেটিই এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত। রেখে গেছেন স্ত্রী শ্যারন, সন্তান অ্যাইমি, কেলি, জ্যাক এবং আগের সংসারের সন্তান জেসিকা, লুইস ও এলিয়টসহ অসংখ্য ভক্তের ভালোবাসা।

তিনি হয়তো আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার সংগীতের শব্দধ্বনি, সেই বিদ্রোহের প্রতিধ্বনি—চিরকাল বেজে যাবে রকের প্রতিটি কর্ডে। বিদায়, ওজি অসবোর্ন। তোমার অন্ধকার আলোয় আজও আলোড়িত বিশ্বসংগীত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত