প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে রাজনৈতিক কারণে দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় বড় অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। জাতীয় সংসদে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মোট ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বাকি মামলাগুলোও পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মুহাম্মাদ আলী আছগারের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সরকারের এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইনি মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা চিহ্নিত ও নিষ্পত্তির জন্য সরকার একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। তার ভাষায়, মামলা দায়েরের সময় অনেক ক্ষেত্রেই এজাহারে রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ থাকে না, ফলে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো মামলা হয়রানিমূলক ছিল তা নির্ধারণ করা সবসময় সহজ নয়। এ কারণে সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেগুলোকে তারা রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক বলে দাবি করে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কতটি মামলা হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মামলা হলেও সেগুলোর প্রকৃতি যাচাই করে আলাদা করা একটি জটিল প্রক্রিয়া।
মন্ত্রী সংসদে আরও জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা চালু করেছে। ২০২৬ সালের ৫ মার্চ জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে মামলার নথি, এজাহার, চার্জশিট এবং পাবলিক প্রসিকিউটরের মতামত বিশ্লেষণ করে কোন মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছে কিনা তা নির্ধারণ করা।
যেসব মামলায় জনস্বার্থে বিচার চালানোর প্রয়োজন নেই এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে, সেগুলো প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ করা হয়। এই সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
আইনমন্ত্রী আরও জানান, জেলা কমিটির সুপারিশ যাচাই-বাছাই করার জন্য সরকার ৮ মার্চ একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেছে, যার আহ্বায়ক হিসেবে তিনি নিজেই দায়িত্ব পালন করছেন। এই ছয় সদস্যবিশিষ্ট কমিটি জেলা পর্যায়ের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্তভাবে মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ২৩ হাজার ৮৬৫টি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের কাজ চলমান রয়েছে। সরকার দাবি করছে, এটি একটি চলমান ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা সম্পূর্ণ করতে সময় লাগবে।
এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এক পক্ষ এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হ্রাসের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষ আবার মনে করছে, অতীতের মামলাগুলোর প্রকৃত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক মামলা প্রত্যাহার একদিকে যেমন রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে বিচার ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব রয়েছে। তাদের মতে, কোন মামলাগুলো সত্যিই হয়রানিমূলক ছিল এবং কোনগুলো অপরাধমূলক ছিল—এটি স্পষ্টভাবে আলাদা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রত্যাহারের প্রবণতা যুক্ত হয়ে আছে। ফলে একটি স্থায়ী ও স্বচ্ছ নীতিমালা ছাড়া এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান কঠিন।
এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক কারণে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার হলে নিরীহ মানুষ উপকৃত হবেন এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়বে। তবে একই সঙ্গে তারা চাইছেন, কোনো অপরাধী যেন আইনের ফাঁক গলে ছাড় না পায়।
সরকার বলছে, তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখে কাজ করছে, যাতে একদিকে রাজনৈতিক হয়রানি কমে, অন্যদিকে বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
সব মিলিয়ে ২৩ হাজারেরও বেশি রাজনৈতিক মামলার প্রত্যাহার বাংলাদেশের বিচার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও টেকসইভাবে সম্পন্ন হয়, সেটিই এখন মূল পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।