হামে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
  • ১৭ বার
হাম উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব থামার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিনই নতুন নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর বাড়িয়ে দিচ্ছে অভিভাবকদের উদ্বেগ। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সোমবার (১১ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ এই মৃত্যুর ঘটনায় দেশে চলমান হাম পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১১ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫০ জনে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি বলেও জানানো হয়েছে। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, সন্দেহজনক হাম এবং নিশ্চিত হাম—দুই ধরনের রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ৩৪১ জন। আর গত প্রায় দুই মাসে সন্দেহজনক হাম রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫০০ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ছয় হাজার ৯৩৭ জনের শরীরে। শুধু গত একদিনেই নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১১৮ জন।

দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল এবং শিশু হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ১৫ মার্চ থেকে ১১ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৮০ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩১ হাজার ৯৯২ জন। তবে এখনো হাজার হাজার শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষ করে যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি কিংবা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণ ও জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে শিশুদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা এতটাই গুরুতর হয়ে পড়ছে যে আইসিইউ সাপোর্ট পর্যন্ত প্রয়োজন হচ্ছে।

রাজধানীর শিশু হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, প্রতিদিনই হাম-সন্দেহে অসংখ্য রোগী হাসপাতালে আসছে। অনেক অভিভাবক প্রথমদিকে বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর বা ভাইরাল সংক্রমণ মনে করে বাসায় চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেন। ফলে রোগের জটিলতা বাড়ার পর হাসপাতালে আনার কারণে চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কয়েক বছর ধরে টিকাদান কার্যক্রমে অনিয়ম, সচেতনতার অভাব এবং করোনাকালীন স্বাস্থ্যসেবার ব্যাঘাত বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। তারা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শতভাগ শিশুকে আনা না গেলে হাম নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় অতিরিক্ত মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার কাজও শুরু করেছেন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকাকে ‘হাই রিস্ক জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সোমবার বরিশাল সফরে সাংবাদিকদের বলেন, টিকা প্রয়োগের পর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২০ সালের পর টিকাদান কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা না থাকায় বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়ে। তাই আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং শিশুদের টিকা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে সচেতনতা কিছুটা বেশি থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো অনেক পরিবার টিকা বিষয়ে ভুল ধারণা পোষণ করে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা বিভ্রান্তিকর তথ্যও টিকাদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে অনেক পরিবার সময়মতো শিশুদের টিকা দিচ্ছে না।

এদিকে আক্রান্ত শিশুর পরিবারগুলোর মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মা বলেন, প্রথমে তারা বুঝতেই পারেননি এটি হাম। জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার পর স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে আনেন। এখন শিশুটি শ্বাসকষ্টে ভুগছে। এমন অসংখ্য পরিবার এখন হাসপাতালের বারান্দায় উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও বাংলাদেশে হামের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

চিকিৎসকরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, শিশুদের জ্বর, ফুসকুড়ি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। একইসঙ্গে টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় এখনো টিকাই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত