প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ২ হাজার ২৭৬ জন নেতাকর্মীকে অপহরণ, গুম এবং ক্রসফায়ারের নামে হত্যার অভিযোগের তদন্ত চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পুনরায় আবেদন করেছে দলটি। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অভিযোগের বিচার ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সোমবার (১১ মে) দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ জমা দেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং গুম, খুন ও মামলা বিষয়ক সমন্বয়ক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন খান। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার উদ্দেশ্যে সংগঠিতভাবে বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
দলটির অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা গুম, অপহরণ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের অবস্থান এখনো অজানা। পাশাপাশি বেশ কিছু ঘটনায় ‘ক্রসফায়ার’ বা বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। দলটির দাবি, এটি একক কোনো ঘটনা নয় বরং ধারাবাহিক রাজনৈতিক নিপীড়নের একটি অংশ। অভিযোগপত্রে বলা হয়, এই ধরনের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।
বিএনপি নেতারা মনে করেন, এসব ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা না হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। তাই তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
দলটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, গুম হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছে। অনেক পরিবার এখনো জানে না তাদের প্রিয়জন জীবিত না মৃত। এই অবস্থায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগে বিভিন্ন ঘটনার তালিকা ও প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হবে কিনা বা পরবর্তী ধাপ কী হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, এই নতুন আবেদন সেই বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও অতীতে একাধিকবার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগগুলো যদি যথাযথভাবে তদন্ত না হয়, তাহলে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং নাগরিক আস্থাও কমে যায়।
বিএনপির নেতারা আশা প্রকাশ করেছেন, ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করবে, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব হয়। তারা বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য, কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে ন্যায়বিচারের দাবি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি কৌশল হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সত্য উদঘাটনের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর সবাই একমত।
সব মিলিয়ে বিএনপির এই নতুন অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।