প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ড। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পুলিশ যেভাবে আন্তঃরাজ্য অভিযান চালিয়ে তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রযুক্তির ব্যবহার, সিসিটিভি বিশ্লেষণ এবং একটি সাধারণ ইউপিআই লেনদেন—সব মিলিয়ে তদন্তের নাটকীয় মোড় এখন দেশজুড়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
গত ৬ মে রাত। কলকাতার উপকণ্ঠে নিজের বাড়ির দিকে ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ রথ। দীর্ঘদিন ধরে শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহকারী হিসেবে কাজ করায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও নিজের মাহিন্দ্রা স্করপিও গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। স্থানীয় সময় রাত ১০টা থেকে ১০টা ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটে যায় ভয়াবহ সেই হামলার ঘটনা।
প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, একটি রুপালি রঙের নিসান গাড়ি আচমকা রথের গাড়ির পথরোধ করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মোটরবাইকে করে আসা দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি ঘটে কয়েক মিনিটের মধ্যে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চন্দ্রনাথ রথকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরপরই পুরো পশ্চিমবঙ্গজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। কারণ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তির এত কাছের সহকারীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়। তদন্তে নামে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ ও বিহার পুলিশের সহায়তায় শুরু হয় যৌথ অভিযান।
তদন্তকারীরা প্রথম থেকেই ধারণা করেছিলেন, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। কারণ হামলাকারীরা অত্যন্ত সংগঠিতভাবে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হামলার পর দুর্বৃত্তরা প্রথমে ব্যবহৃত নিসান গাড়িটি ফেলে রেখে অন্য একটি লাল রঙের গাড়িতে পালিয়ে যায়। সঙ্গে ছিল মোটরবাইকও। এই গাড়িগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করতে গিয়ে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পায়।
কলকাতার কাছে বালির একটি টোল প্লাজায় গাড়িটি টোল পরিশোধ করেছিল। প্রথমে বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও পরে দেখা যায়, সেখানে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল। তদন্তকারীরা সেই ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ট্র্যাক করতে সক্ষম হন। আর এই তথ্য থেকেই ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে অভিযুক্তদের পরিচয়।
পুলিশ পরে জানতে পারে, বিশাল শ্রীবাস্তব, রাজ সিং এবং ময়ঙ্ক মিশ্র নামে তিন ব্যক্তি একই গাড়িতে ছিলেন। তাদের অবস্থান শনাক্ত করে বিহার ও উত্তরপ্রদেশে অভিযান চালানো হয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনজনকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার না হলে এত দ্রুত এই মামলার অগ্রগতি সম্ভব হতো না।
গ্রেপ্তার হওয়া বিশাল শ্রীবাস্তবের বিরুদ্ধে আগে থেকেই খুন, ডাকাতি ও সশস্ত্র হামলাসহ ১৫টির বেশি ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার বাড়ি বিহারের বক্সারে। অন্য দুই অভিযুক্ত রাজ সিং ও ময়ঙ্ক মিশ্র উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা। তদন্তকারীদের দাবি, তারা সবাই পেশাদার অপরাধী চক্রের সদস্য এবং ভাড়াটে খুনি হিসেবেও পরিচিত।
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ নাকি আর্থিক বিরোধ—তা নিয়ে এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ। তবে তদন্তকারীরা বলছেন, পরিকল্পনার ধরন দেখে মনে হচ্ছে হামলাকারীরা আগে থেকেই চন্দ্রনাথ রথের চলাচলের রুট ও সময় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানত। ফলে ভেতরের কোনো তথ্য ফাঁস হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলেও এ ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে রাজ্য সরকার বলছে, দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার হওয়াই প্রমাণ করে প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে অপরাধ তদন্তে ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকিং লেনদেন, মোবাইল লোকেশন, সিসিটিভি ফুটেজ ও ইলেকট্রনিক পেমেন্টের তথ্য এখন অপরাধীদের শনাক্ত করার বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডেও সেই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
একজন তদন্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা হয়তো বুঝতেই পারেনি যে একটি সাধারণ টোল প্লাজার ইউপিআই পেমেন্ট শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান ফাঁস করে দেবে। অপরাধের পর নিজেদের আড়াল করতে তারা গাড়ি বদল করেছিল, রুট পরিবর্তন করেছিল, এমনকি কয়েকটি এলাকায় মোবাইল ফোনও বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যই শেষ পর্যন্ত তাদের ধরা পড়ার পথ তৈরি করে দেয়।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এত কাছ থেকে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তাদের সহযোগীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সোমবার বারাসত আদালতে তিন অভিযুক্তকে তোলা হওয়ার কথা রয়েছে। পুলিশ তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়। তদন্তকারীদের আশা, জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী এবং সম্ভাব্য অর্থদাতাদের বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ড এখন শুধু একটি খুনের মামলা নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তেরও একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। অপরাধীরা যতই কৌশলী হোক না কেন, ডিজিটাল যুগে ছোট একটি ভুলও যে বড় সূত্রে পরিণত হতে পারে—এই ঘটনাই যেন আবারও সেই বার্তা দিল।