নূর খান ঘাঁটিতে ইরানি যুদ্ধবিমান নিয়ে নতুন বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
মার্কিন হামলা থেকে বাঁচতে পাকিস্তান নুর খান বিমানঘাঁটিতে ইরানের যুদ্ধবিমান রাখার অনুমতি দেয়

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই পাকিস্তানের নূর খান বিমানঘাঁটি ঘিরে নতুন এক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন ও ইসরাইলি সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে ইরানের সামরিক সম্পদ রক্ষার জন্য পাকিস্তান নাকি তাদের কিছু যুদ্ধবিমান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এই কৌশলগত ঘাঁটিতে রাখার অনুমতি দিয়েছিল।

তবে পাকিস্তান এ ধরনের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। দেশটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নূর খান বিমানঘাঁটিকে ঘিরে প্রকাশিত তথ্য “অবাস্তব ও ভিত্তিহীন”। তিনি বলেন, ঘাঁটিটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় সেখানে বড় ধরনের সামরিক সরঞ্জাম গোপন রাখা বা স্থানান্তর করা কার্যত অসম্ভব।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার সময়ই তেহরান তাদের কিছু সামরিক ও বেসামরিক বিমান প্রতিবেশী দেশে স্থানান্তর করে। এর মধ্যে কিছু বিমান নূর খান ঘাঁটিতে রাখা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামাবাদের কাছে অবস্থিত নূর খান বিমানঘাঁটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক স্থাপনা। এটি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর অন্যতম সংবেদনশীল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যেখানে উচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কৌশলগত বিমান ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ রাখা হয়।

সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ইরান তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এই ঘাঁটিতে স্থানান্তর করেছিল, যার মধ্যে একটি আরসি-১৩০ গোয়েন্দা বিমানও থাকতে পারে। এটি লকহিড নির্মিত সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানের বিশেষ সংস্করণ, যা মূলত নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার ধারণা অনুযায়ী, এসব বিমান ও সরঞ্জাম স্থানান্তরের উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা থেকে ইরানের সামরিক সম্পদ রক্ষা করা। যদিও একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য আলোচনা চলছিল, তবে পর্দার আড়ালে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মার্কিন আইনপ্রণেতারা পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, যদি এই তথ্য সত্য হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং অন্যান্য পক্ষের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হবে।

তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, কৌশলগত স্থানে সামরিক সম্পদ স্থানান্তর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নূর খান ঘাঁটি নিয়ে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে তা বাস্তবসম্মত নয়। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেন, ঘাঁটিটি জনবহুল এলাকার মধ্যে হওয়ায় সেখানে বড় ধরনের গোপন সামরিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনেক তথ্যই অতিরঞ্জিত বা যাচাইবিহীন।

এদিকে প্রতিবেশী আফগানিস্তানও বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে। আফগান বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির সময় একটি ইরানি বেসামরিক বিমান কিছু সময়ের জন্য কাবুল বিমানবন্দরে অবস্থান করেছিল। তবে সেটি সামরিক বিমান ছিল কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়।

আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, আঞ্চলিক সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে বেসামরিক বিমানগুলোকে বিকল্প স্থানে রাখা হয়।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা ইস্যুতে টানাপোড়েন বেড়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের প্রতিবেদন আঞ্চলিক কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তির মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে, তখন এমন অভিযোগ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তবে পাকিস্তান জোর দিয়ে বলেছে, তারা সবসময় আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক নিয়ম মেনে চলেছে এবং কোনো দেশের সামরিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বা সহযোগিতা করার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা সত্য হোক বা না হোক, এটি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ নূর খান ঘাঁটির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাকে ঘিরে যেকোনো খবর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে ইরানি যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের নূর খান ঘাঁটিতে রাখার দাবি ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা এখন শুধু সামরিক নয়, বরং কূটনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপই এখন এই বিতর্কের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত