প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফেনীর দাগনভূঞায় মর্মান্তিক এক পারিবারিক হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো এলাকা। পরিবারের ভালোবাসা ও স্বাভাবিক আচরণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করার ক্ষোভ থেকেই নিজের মাকে হত্যা করেছেন বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মোশারফ হোসেন রাফি। শুধু মা নন, হামলার শিকার হয়েছেন তার বাবা ও ছোট বোনও। একটি পরিবারের ভেতরের দীর্ঘদিনের মানসিক টানাপোড়েন, অভিমান, দূরত্ব এবং অবহেলার অনুভূতি কীভাবে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সেই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মনে।
মঙ্গলবারও দাগনভূঞার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের দিলপুর গ্রামের সেই বাড়িতে ছিল শোকের ভারী আবহ। প্রতিবেশীরা বলছেন, বাইরে থেকে পরিবারটিকে সাধারণ ও শান্তিপূর্ণই মনে হতো। কিন্তু ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা যে এমন রক্তাক্ত ঘটনার জন্ম দেবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দাগনভূঞা আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন ২২ বছর বয়সী মোশারফ হোসেন রাফি। সেখানে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারের সদস্যরা তাকে ভুল বুঝতেন এবং অবজ্ঞা করতেন। বিশেষ করে মা লাকি আক্তারের আচরণ তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাফির ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সিগারেটের প্রতি আসক্ত ছিলেন, তবে অন্য কোনো মাদক গ্রহণ করতেন না। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তাকে মাদকাসক্ত ও বখাটে হিসেবে দেখতেন। এ নিয়ে প্রায়ই তাকে অপমানজনক কথা শুনতে হতো। তিনি আদালতে দাবি করেন, তার মা প্রায়ই তাকে বলতেন— “তুই মাদকসেবী, তোর মতো ছেলে দরকার নেই, তুই মরে যা।” এসব কথায় তিনি মানসিকভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়েন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাফি তার জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেছেন যে, পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কও স্বাভাবিক ছিল না। বেশিরভাগ সময় তিনি নানার বাড়িতে থাকতেন। এসএসসি পাস করার পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্বাসকষ্ট ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন বলেও জানিয়েছেন। তার পরিবার কয়েকবার মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছেও নিয়ে গিয়েছিল বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন তিনি।
ঘটনার দিন কী হয়েছিল, সেই বর্ণনাও দিয়েছেন রাফি। তিনি বলেন, নানার বাড়ি থেকে ফিরে এসে মাকে মাথা টিপে দিতে বলেন। কিন্তু মা তাকে দূরে সরিয়ে দেন। সেই মুহূর্তে তিনি নিজের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। প্রথমে ছুরি দিয়ে মায়ের ওপর আঘাত করেন। পরে মায়ের চিৎকার শুনে বাবা মোস্তফা ভূঞা ও বোন মিথিলা মোস্তফা সাহারা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মা লাকি আক্তার। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর লাশ খাটের নিচে লুকানোরও চেষ্টা করেছিলেন রাফি। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে আটক করে। আহত বাবা ও বোনকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক খন্দকার মো. আবদুল মোতালেব জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি ছুরি রাফি অনলাইনে অর্ডার করে কিনেছিলেন। শনিবার ছুরি দুটি হাতে পাওয়ার পর থেকেই তিনি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। রোববার রাতে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাটি কেবল একটি পারিবারিক বিরোধ নয়; বরং এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরও প্রতিফলন। বর্তমানে তরুণদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, পারিবারিক যোগাযোগের অভাব এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঘাটতি ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারে মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলা করা হয়, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের অনেকে জানিয়েছেন, রাফি ছোটবেলা থেকেই কিছুটা চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। তবে তার ভেতরে এত গভীর ক্ষোভ জমে ছিল, তা কেউ বুঝতে পারেননি। প্রতিবেশীরা বলছেন, পারিবারিক কলহ বা অশান্তির শব্দ তারা কখনো তেমন শোনেননি। তাই ঘটনাটি তাদের জন্য ছিল পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবারে অবহেলার অনুভূতি বা বারবার অপমানের শিকার হওয়া অনেক সময় তরুণদের মধ্যে ভয়াবহ মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা কেউ যদি প্রয়োজনীয় সহানুভূতি ও কাউন্সেলিং না পান, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয় না— বরং এটি একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়।
এদিকে এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে আলোচনা। কেউ বলছেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আবার অনেকে মনে করছেন, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে।
রাফির বিরুদ্ধে দাগনভূঞা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তার ফুফু শরীফা বেগম। পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি দুটি আলামত হিসেবে জব্দ করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুরো ঘটনার পেছনে মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সম্পর্ক এবং পরিকল্পিত প্রস্তুতির বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ফেনীর এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, একটি পরিবারের ভেতরের অদৃশ্য মানসিক দূরত্ব কত ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। ভালোবাসা, বোঝাপড়া ও সহমর্মিতার অভাব যখন ক্ষোভে পরিণত হয়, তখন তার মূল্য দিতে হয় পুরো পরিবারকে। এখন একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে, আর একজন তরুণের ভবিষ্যৎও অন্ধকারে ঢেকে গেছে।