প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনগুলোর একটি কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৯তম আসর আজ থেকে শুরু হয়েছে। ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় শহর কানের লালগালিচা, সমুদ্রতীরবর্তী ভেন্যু এবং নান্দনিক পরিবেশে শুরু হওয়া এই উৎসব ঘিরে বিশ্বজুড়ে সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ।
প্রতিবছরের মতো এবারও উৎসবটি কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক সিনেমা শিল্পের চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম কেন্দ্র। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক এবং সমালোচকরা এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন, যেখানে নতুন সিনেমার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হবে।
উৎসবের উদ্বোধনী দিনেই কানের ঐতিহ্যবাহী লালগালিচায় তারকাদের উপস্থিতি নজর কাড়ে। ঝলমলে পোশাক, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সরব উপস্থিতি উৎসবের পরিবেশকে আরও বর্ণাঢ্য করে তোলে। দীর্ঘদিন ধরে কান উৎসবকে শুধু সিনেমার নয়, ফ্যাশন ও সংস্কৃতির বৈশ্বিক প্রদর্শনী হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
এবারের উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত চলচ্চিত্র ‘পাম দ’অর’ বা স্বর্ণপামের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এই পুরস্কারকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়। পাশাপাশি ‘আঁ সার্তে রিগা’, ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’ এবং বিশেষ প্রদর্শনী বিভাগেও থাকবে বৈচিত্র্যময় চলচ্চিত্রের সমাহার।
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, কান উৎসব এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে নতুন নির্মাতারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচিত করার সুযোগ পান। অনেক সময় এখানে প্রদর্শিত স্বল্প বাজেটের চলচ্চিত্রও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে। ফলে তরুণ নির্মাতাদের জন্য এই উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এবারের আসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হলিউডের তুলনামূলক অনুপস্থিতি। সাধারণত বড় বড় মার্কিন স্টুডিওগুলো তাদের ব্লকবাস্টার সিনেমা নিয়ে কানে হাজির হলেও এবার সেই উপস্থিতি অনেকটাই সীমিত। বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারণার কৌশল পরিবর্তন, ব্যয় সংকোচন এবং কানের সমালোচনামূলক পরিবেশের কারণে হলিউড এবার কিছুটা দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ইউরোপীয়, এশীয় এবং অন্যান্য অঞ্চলের সিনেমা উৎসবটিকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। বিশেষ করে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অংশগ্রহণ এবারের আসরকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
চলচ্চিত্র উৎসবের পাশাপাশি এবারের কানে স্থান পেয়েছে খেলাধুলা ও ইতিহাসভিত্তিক কিছু বিশেষ ডকুমেন্টারি। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সের সাবেক ফুটবলার এরিক কাঁতোয়াঁকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘কাঁতোয়াঁ’। এছাড়া ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের বিতর্কিত ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল নিয়ে নির্মিত ‘দ্য ম্যাচ’ শিরোনামের ডকুমেন্টারিও প্রদর্শিত হবে।
এই ধরনের ক্রীড়া-ভিত্তিক ডকুমেন্টারি কান উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সিনেমার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের ঘটনা ও ইতিহাসভিত্তিক গল্পও এখন উৎসবের অংশ হয়ে উঠছে, যা দর্শকদের নতুন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।
উৎসবকে ঘিরে কানের শহর এখন পর্যটক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ভিড়ে সরগরম। হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং বিভিন্ন ভেন্যুতে চলছে ব্যস্ততা। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, উৎসব চলাকালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের এই মহাযজ্ঞ আগামী কয়েকদিন ধরে চলবে। প্রতিদিনই নতুন নতুন চলচ্চিত্র প্রদর্শন, প্রিমিয়ার এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে কান হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক সিনেমার প্রাণকেন্দ্র। বিশেষ করে তরুণ নির্মাতা ও স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য এই উৎসব ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, কান উৎসব কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি বিশ্ব সিনেমার প্রবণতা, শিল্পের পরিবর্তন এবং নতুন ধারার প্রকাশ। প্রযুক্তির বিকাশ, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং দর্শক অভ্যাসের পরিবর্তনের মধ্যেও কান তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
সব মিলিয়ে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্ব সিনেমার জন্য একটি নতুন যাত্রার সূচনা করছে। লালগালিচার ঝলক, চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই উৎসব আবারও প্রমাণ করছে—কান শুধু একটি শহর নয়, এটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের হৃদয়।