অর্থনীতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হবে না: অর্থমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
Amir Khasru Mahmud Chowdhury

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, দেশের পুঁজিবাজার, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সরকার বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করছে। রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির উদ্বোধনী ও ফান্ড ঘোষণা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব নীতির প্রশ্নে এই বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে দেশের আর্থিক খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও পুঁজিবাজারে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও আস্থাহীনতা নিয়ে নানা আলোচনা চলমান থাকার প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক খাতকে রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে রেখে পরিচালনা করতে চায়। বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশকে টেকসই ও স্বচ্ছ করার জন্য প্রয়োজন পেশাদার ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা। তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজারের প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং এটিকে ইতিবাচক সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তিনি মনে করেন, সঠিক নীতি সহায়তা এবং আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। দেশের ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অংশগ্রহণে গঠিত এই প্ল্যাটফর্ম প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা সমমূল্যের মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের স্টার্ট-আপ খাতের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

ফান্ডটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সিড, লেট-সিড এবং সিরিজ-এ পর্যায়ের উদীয়মান স্টার্টআপগুলোকে বিনিয়োগ সহায়তা দেওয়া। অর্থাৎ যেসব তরুণ উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী ধারণা রয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে বড় পরিসরে যেতে পারছেন না, তাদের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তি, ফিনটেক, কৃষি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল সেবাভিত্তিক স্টার্টআপগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

বাংলাদেশে গত এক দশকে স্টার্টআপ খাত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে ই-কমার্স, অনলাইন সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট, লজিস্টিকস এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। তবে এই খাতের বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের অভাব। অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি বিনিয়োগ বা ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছেন। সেই বাস্তবতায় এই নতুন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডকে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন উদ্যোক্তা বলেন, ব্যাংকঋণের প্রচলিত কাঠামো অনেক সময় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য উপযোগী নয়। কারণ স্টার্টআপের শুরুতে সম্পদ বা জামানতের চেয়ে আইডিয়া, দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভেঞ্চার ক্যাপিটালভিত্তিক অর্থায়ন তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক খাত গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু বক্তব্য নয়, কার্যকর সংস্কারও প্রয়োজন। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা, আর্থিক অনিয়ম এবং করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্বচ্ছতা, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই বলে মত তাদের।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা সংকট, মূল্যস্ফীতি, ডলারের চাপ এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়ে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাজারনীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদের ওপর। তাই শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, নতুন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকে সমানভাবে সহায়তা দিতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণে স্টার্টআপ খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

এদিকে সরকারের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে এটিকে দেশের স্টার্টআপ সংস্কৃতির জন্য আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

সব মিলিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য এবং নতুন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্মের যাত্রা দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত নীতিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার কতটা কার্যকরভাবে বিনিয়োগবান্ধব ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, আস্থা ও সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত