প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় গভীর রাতে একটি সেচ পাম্পের বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির চেষ্টা করতে গিয়ে গণপিটুনিতে মো. রাফি মন্ডল (২৪) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার (১৯ মে) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে শেরপুর উপজেলা–এর কুসুম্বি ইউনিয়নের চন্ডেশ্বর গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত রাফি মন্ডল ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ী ইউনিয়নের নাটাবাড়ী গ্রামের বুলু মন্ডলের ছেলে। আহত জাহাঙ্গীর হোসেন (৩২) একই এলাকার বড়বিলা গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামের কৃষকদের ব্যবহৃত একটি সেচ পাম্পের ট্রান্সফরমার দীর্ঘদিন ধরে চুরির ঝুঁকিতে ছিল। এ কারণে পাম্প মালিক রমজান আলী ও আব্দুল জলিল চুরিরোধে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তারা ট্রান্সফরমারের সঙ্গে একটি অ্যালার্ম ডিভাইস সংযুক্ত করেন, যা কোনো অননুমোদিত নড়াচড়া হলেই সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে সতর্ক সংকেত পাঠায়।
ঘটনার রাতে রাফি ও জাহাঙ্গীর ওই ট্রান্সফরমারটি চুরি করার উদ্দেশ্যে সেখানে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা ট্রান্সফরমার খোলার চেষ্টা করার সময় অ্যালার্মটি সক্রিয় হয়ে যায় এবং মালিকপক্ষের মোবাইলে সতর্ক বার্তা পৌঁছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে আসে।
স্থানীয় কয়েকটি গ্রামের মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুই যুবককে ঘিরে ফেলে। উত্তেজিত জনতার মধ্যে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে দুইজনই গুরুতর আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে স্থানীয়রা দ্রুত শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স–এ ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার (২০ মে) ভোর সাড়ে চারটার দিকে রাফি মন্ডলকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আহত জাহাঙ্গীর হোসেন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে শেরপুর থানা–পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পুলিশ বলছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং গণপিটুনির পরিস্থিতি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মঈনুদ্দীন বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির চেষ্টা করার সময় গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। এতে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। মরদেহ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে এবং এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুৎ সরঞ্জাম চুরির ঘটনা আগে থেকেই ঘটছিল। ফলে তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে বাধ্য হন। তবে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে এখন এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী হওয়া উচিত। গণপিটুনি বা ‘মব জাস্টিস’ পরিস্থিতি কখনোই সমাধান নয়, বরং তা নতুন করে আইনগত জটিলতা ও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়।
অন্যদিকে স্থানীয়রা বলছেন, কৃষিনির্ভর এই এলাকায় সেচ পাম্প ও ট্রান্সফরমার চুরি কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজ উদ্যোগে পাহারা ও সতর্ক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিহত রাফি মন্ডলের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ট্রান্সফরমার চুরির চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই গণপিটুনির ঘটনা আবারও দেশজুড়ে গণসচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।